আজ একটি শোচনীয় মৃত্যুকাহিনীর মুখোমুখি হলাম কর্মক্ষেত্রে। মৃত্যু নয়, হত্যা।
ঘাতকের নাম বাইপোলার ডিজর্ডার — একপ্রকারের মনোরোগ।
অবিরল বৃষ্টির ময়লা, বিষণ্ণ আবহে মন আরও দ্রব হলো কান্নায়।
কবি বলে দিয়েছেন, সবাই জানে, ডিপ্রেশনের বাংলা মানে মনখারাপ। আজ মেঘলা সকালে জানলার ধারে বসে যে পরিচিত মানুষটির অকারণেই দু’চোখ জলে ভরে আসছে, কিংবা কাজের জায়গায় যে সহকর্মীটি কিছুতেই জরুরি নির্দেশগুলি মনে রাখতে না পেরে লজ্জিত, বিপন্নমুখে বারে বারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লালচোখ দেখছেন, তাকে ব্যঙ্গ বা সমালোচনা না করে তাঁর পিঠে সহমর্মিতার হাত রাখা কি এতই কঠিন? প্রতিমুহূর্তেই নিজের কথা বকবক না করে কোনও অসহায় বিষাদগ্রস্ত মানুষের মনের আগল খোলা কথার ধৈর্যশীল শ্রোতা হওয়া কি একান্তই অসম্ভব?
মনের সাকিন মস্তিষ্কে আর মন খারাপের উৎস প্রায় সবসময়ই শারীরিক — বিভিন্ন দেহজ রাসায়নিকের তারতম্য বা অসামঞ্জস্যের প্রভাবে সিংহভাগ মনোরোগ হয়ে থাকে, এ কথা জানতে আজকের যুগে চিকিৎসক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। অথচ হামেশাই দেখি কোয়ান্টাম ফিজিক্স, সুররিয়ালজম, মার্কেজের উপন্যাস কিংবা শেয়ার মার্কেটের চোরা উত্থানপতন হেলায় বুঝে ফেলা আমার তুখোড় সহনাগরিকেরা তাঁদের আত্মজনের মনও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না।
তাই মনোরোগীর নিরুপায় বিষণ্ণতা বা নির্জন হতে চাওয়ার বাসনা ‘ন্যাকামি, সেয়ানা পাগলামি, একলষেঁড়েপনা, গুজগুজে শয়তানি’ ইত্যাদি আখ্যা পাচ্ছে সামাজিক পরিসরে।
কারণটি তলিয়ে ভাবার আগেই বসে যাচ্ছে বিচারসভা। সেখানে যার যত গলার জোর, যুক্তির জোর, সে তত ‘হোলিয়ার দ্যান দাও’! অন্যের কষ্টের কথা কান পেতে শোনার সংবেদকে লম্বা ছুটিতে পাঠিয়ে সেই বিচারসভায় সকলেই ‘পারফেক্ট’। তাই সামান্যতম ব্যতিক্রমী আচরণকারী সহমানবকে ‘পাগল’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার হিংস্র, বর্বর ট্রাডিশন যুগে যুগে অব্যাহত।
কেন এত সমালোচনা? এত অসহিষ্ণুতা, এত ছিদ্রান্বেষণ কিসের জন্য? ‘সবার তুমি খুঁত দেখেছ, নিখুঁত কেবল নিজে?’ — এমন হয়, না হতে পারে? কেন একটু সহমর্মী হতে পারি না আমরা, বাড়িয়ে দিতে পারি না সমবেদনার হাত? এতই কি কঠিন?
কেন এখনও স্বেচ্ছায় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া বা যেতে চাওয়া মানুষজনের জন্য জোটে বিদ্রূপ আর করুণা? ‘একটু সহ্য করতে পারল না? এত সহজেই হেরে গেল? তাহলে আর মানুষ কিসের? এ তো পলায়নী মনোবৃত্তি, মানসিক দৃঢ়তার অভাব’ — এই সব কথা অনবরত শুনে যেতে হয় তাদের দুর্ভাগা প্রিয়জনদের।
‘আমাদের সময় সব ভাল ছিল’ আওড়ানো সবজান্তা বরিষ্ঠ নাগরিক থেকে আরম্ভ করে ‘সিচুয়েশনশিপ’ আর ‘ব্রেডক্রাম্বিং’ লব্জে অভ্যস্ত জেন জ়েড বা জেন আলফা — অন্যের জুতোয় পা গলিয়ে তার পরিস্থিতি বিচার করার অনীহার ক্ষেত্রে আলোকবর্ষ দূরের এই দুই প্রজন্মের মানসিকতার বিশেষ ফারাক দেখতে পাই না।
আমার মতো স্পর্শকাতর মানুষের সম্বল কেবল বেদনা আর যন্ত্রণা — যা ধীরে ধীরে গড়ে তোলে অনতিক্রম্য এক বিষাদসমুদ্র – নোঙর ফেলার কোনও বন্দর নেই, নেই কোনও একচক্ষু দিঙনাগ বাতিঘর।
আমি কেবল স্তব্ধ হয়ে শুনি, সদ্য পিতৃহীন, ব্যাকুল দশবছুরে বালিকাকে তার শোকজর্জর মা হাতের পিঠে কান্না মুছে হ্যারি পটার পড়ে শোনাচ্ছে —
‘মন খারাপ করে না লক্ষ্মী মাণিক আমার — দ্যাখো, হ্যারির তো মা-বাবা দু’জনেই সেই ক–বে মারা গিয়েছিলেন, তা সত্বেও হ্যারি মনের জোরে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই করে বদমায়েশ ভলডেমর্টকে শায়েস্তা করে ফেলল! তোমার তো তা-ও আমি আছি সোনা, তোমার মা আছে তো! আর কাঁদে না, ছিঃ!’
আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মেন্টাল হেলথ পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন —
”মানসিক স্বাভাবিকতা অর্থাৎ স্যানিটি যদি মেঝের ওপর টানা একটি সরলরেখা হয় যার একদিকে থাকে সুস্থির মন আর অন্যদিকে তথাকথিত ‘পাগলামি’, তবে মানুষ সেই সরলরেখার দুই দিকে দুই পা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে — পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কাঁটায় দুলছে তার ভারসাম্য। কখনো লাইনের একদিকে ঢলে পড়ছে, তো কখনো অন্যদিকে।”
আমরা প্রতিমুহূর্তে অপরের ব্যবহার আর আচরণের ঠিক-ভুলের বিচার করতে করতে ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, যে আমি, আপনি প্রত্যেকে সেই অদৃশ্য সরলরেখার দু’দিকে পা রেখে দাঁড়িয়ে আছি। এই কঠিন ধাবমান জীবন আমাদের কখন কোন দিকে ঠেলে ফেলে দিয়ে কক্ষচ্যুত করে দেবে আমরা কেউই জানিনা। সত্যিই জানি না।
ছবি: আন্তর্জাল











