গোবিন্দগঞ্জ ভটচায্যি পাড়ার বড় বাড়ির গিন্নি সুরধুনীর সঙ্গে ভাঙাপাড়ার ছেঁড়া কানি পরা ক্ষ্যান্তমণির ভারি ভাব। দুজনেরই এখন ষাট পেরিয়েছে। কাছাকাছি সময়েই ওরা দুজন এই আধাশহরে বিয়ে হয়ে এসেছিল।
ক্ষ্যান্ত প্রায় নিয়মিতই আসে। দুপুর পেরিয়ে। দুজনে গল্পগাছা করে। এই ভালোবাসায় স্বার্থগন্ধ যে মোটে নেই, তা না।
ক্ষ্যান্ত হাতে হাতে কিছু কাজ করে দেয়। যেমন ধরো কটা কাচা কাপড় এট্টু ভাঁজ করে দিল। সদ্য এঁটো বাসনটায় জল বুলিয়ে দিল। ঠিকে কাজের লোক আছে যদিও।
দামি ম্যাক্সি পরা সুরধুনী সাবধানি চোখে তার সেই কাজ দেখতে দেখতে গল্পগাছা করার মাঝেই বলে ওঠে কখনও,- ওই ওপাশের লাল ডুরে শাড়িটা তুই বরং নে যা ক্ষ্যান্ত।
তা নেয় বইকি ক্ষ্যান্ত। নেয়।
জ্যালজেলে ফেঁসে যাওয়া ওরম শাড়ি, কী তুবড়ে যাওয়া বাসন কখনও। সুরোর এই সব ফেলনা উপকরণ তার গরিব সংসারে কাজে লেগে যায়। নিতে বললে, নেব না বলার সাহস হয় না ক্ষ্যান্তর। কে জানে, না নিলে রাগ করে যদি মোটেই দেওয়া বন্ধ করে দেয়!
নেহাত অব্যবহার্য হলেও নেয়, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে ফেলে দেয় রাস্তার ধারে কোথাও।
গল্প করতে গিয়ে দেরি হলে চলবে না। খেয়াল রাখতে হয়। লোচনের বাপ বাংলা মালের শুঁড়িখানা থেকে ফিরে ওকে না দেখলে খামোকা চেঁচাবে খানিক।
দেয়া নেয়ার সম্পর্ক থাকলেও দুজনের সখ্য-সখিত্ব কিছু আছেই।
তা এই দুজনের মধ্যেও একটু মন কষাকষি হয়ে গেল আজ।
ব্যাপার কী?
সুরো বউ, দুপুরে ক্ষ্যান্তকে বড়মুখ করে মোবাইলে ছবি দ্যাখাচ্ছিল। তার একছেলে আর এক মেয়ে। নাতি নাতনিও হয়েছে কটি। দুঘরেই। – দ্যাখ দ্যাখ ক্ষ্যান্ত, এই হল গে আমার বড় ছেলের বাড়ি। আম্রিকায় কলোরাডো নাম শুনিচিস? সেকেনে থাকে। এই যে নাতি আর ছেলে বউ। দেকতে ভারি মিষ্টি না?
মন জোগানো কথা বলতে ক্ষ্যান্তমণির জুড়ি নেই। বলে,- তোমার বিটিছানাটাও কিন্তু দিদি দেকতে বেশ। ওই যে ওদিন ছবি দেকালে সেদিন। মেয়ে জামাই আর নাতিনের। সেও তো ওই দেশেই, না গো?
– দুস্, সে দেশে নয় রে। ওরা থাকে সুইজারল্যান্ডে। সগ্গের মত সে দেশ,অনেক দূরে। দুদেশের মাজে একটা মস্ত সমুদ্দুর, বুইলি! নিয়ে গেসলো বটে একবার আমাকে। খচ্চাও অনেক। তা চাড়া সে সব দেশে মা বাবাকে পারমেন রাকার নিয়ম নেই।
কথার পিঠে কথা এগোয়।
ক্ষ্যান্তর দুই ছেলে। বড়টির বিয়ে হয়েছে। । ছোটোটির এখনও হয়নি। বড়ো বউ এখানে তার কাছেই থাকে। দুবেলা মিলিয়ে চার বাড়িতে কাজ করে। কাছেই নিউটাউনে। সাইকেলে করে যায়। মাস গেলে হাজার পনেরো টাকা রোজগার তার।
ক্ষ্যান্ত বলে,- ওই তোমার মত একই কপাল আমাদেরও। থেকেও নেই। বড়খোকা লোচন সেই কেরলে। আর ছোটো খোকার বোম্বেতে রাজমিস্তিরির কাজ। তা ওদের ওকেনেও খচ্চা অনেক। লোচন তাই বউকে আমাদের কাচেই রেকে গ্যাচে। সাথে নে যেতে পারলনি। একদিকে ভালোই। বউমা আমাদের দেকে রাকে।
তোমার কলোরাডো আর আমার কেরল। আমার তো তবু বউমাটা কাচে রয়েচে। ব্যাধি-রিষ্টিতে না হোক দ্যাকে৷ তোমার তো তাও নয়।
তুলনা শুনে অবধি সুরোধুনীর মাথা গরম। আ মর, গুমোর দ্যাক ছেঁড়া কানি পরা আবাগির! কোতায় আম্রিকার কলোরাডো আর কোতায় কেরল।
সেই মাথা গরম কমেও যায়।
কী করে? কোন মন্ত্রে?
সুরো বউকে পাশে বসিয়ে খোকাদের রিটায়ার্ড বাপ ব্যালকনিতে বসে রোজ সন্ধে বেলায়। হুইস্কির গেলাসে চুমুক দেয়। আবগারির দারোগা ছিল। সেই থেকে অভ্যেস। সুরধুনীও বলতে নেই ওই গেলাস নিয়ে বসাটি অভ্যেস করে ফেলেছে। সুরো ভাবে সঙ্গদোষ। ওর সোয়ামী, মিস্টার মল্লিক বলে, ওতে কোনও দোষ নেই। সোশ্যাল ড্রিংকিং।
সুরোর মুখে মন কষাকষির খবর জেনে মল্লিক সায়েব বলে, বোঝায়, – দ্যাকো গিন্নি, সে ভাবে ভেবে দেখলে, সত্যিই ব্যাপার তো একই। ওদের ছেলেও বাইরে চাকর হতে গেছে। আমাদের শিক্ষিত ছেলেও ওই চাকর হতেই দূর বিদেশে। তা, হ্যাঁ গো, চাকরে চাকরে ভেদ কল্লে হবে?
শুনেটুনে এতক্ষণে সুরো মদের ঝোঁকে ক্ষমা করে দেয় তার সখীকে।
★









