সন্ধ্যের কিছু পরে চেম্বারে ততক্ষণে বেশ কিছু রোগী দেখা শেষ করে ফেলেছি। প্রতিদিনের গড্ডালিকা প্রবাহে এখন রোগের থেকেও বেশি লড়তে হয় রোগীর ভুল ধারণা বা ভুল চিকিৎসার বিরুদ্ধে। সেদিনের সন্ধ্যেও ব্যতিক্রমী হলো না। মধ্য তিরিশের এক শীর্ণকায় ভদ্রমহিলা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। জানুয়ারীর ঠান্ডাতেও রীতিমতো ঘেমে নেয়ে একসা। হাত দুটি থরথর করে কাঁপছে। বিস্ফারিত চোখদুটো।
চেয়ার টেনে ধপ করে বসেই বললেন – আমায় বাঁচান ডাক্তারবাবু। গত দুমাস ধরে রাত্রে ঘুম হচ্ছে না। সারা শরীরে ধড়পড়ানি। অস্বস্তি ভাব।
কথাগুলো শ্রুতিকটু ভাবেই অত্যন্ত দ্রুত বললেন বলেই মনে হলো।
হাত দুটো টেনে নিয়ে শুন্যে ঝুলিয়ে দেখলাম অসংলগ্ন ভাবে কেঁপে কেঁপে উঠছে। গলায় জড়ানো স্কার্ফটা সরাতেই দেখলাম গলাও যেন স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশিমাত্রায়ই ফোলা। চাপ দিয়ে দেখলাম গলায় কোনও ব্যথা নেই।জিভ বের করতে বলতেই ফোলা অংশটা কিছুটা ওপরে উঠে এলো।আবার জিভ ঢোকাতেই নিচেও নেমে গেলো আগের মতই।
অর্থাৎ কিনা থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের ফোলা। প্রশ্ন করলাম,ক্ষিদে কেমন? ভদ্রমহিলা লজ্জিত মুখে বললেন,প্রায় সবসময়ই ক্ষিদে পায়। কিন্তু খেলেও গতরে লাগছে কই? এই তো চেহারা!
গলার ফোলা, হাতের কাঁপুনি, অতিরিক্ত ঘাম, বিস্ফারিত চোখ,অনিদ্রা, রোগা গড়ন। আমি ততক্ষণে অংক মেলাতে শুরু করেছি। হাত টেনে পালস দেখলাম। স্বাভাবিকের থেকে অনেক দ্রুতই চলছে পালস। প্রেসারও ঊর্ধ্বমূখী। অর্থাৎ কিনা থাইরোটক্সিকোসিস। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের থেকে বেরোনো থাইরক্সিন হরমোনের আধিক্যের ফলে সাধারণত এই সমস্যা হয়।
ভদ্রমহিলাকে সেকথা বলতেই ব্যাগ থেকে একখান রিপোর্ট বের করলেন। থাইরয়েড প্রোফাইলের রিপোর্ট। আমার অনুমান সঠিক। থাইরক্সিন হরমোনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বাড়া। আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নেগেটিভ ফিডব্যাকের প্রভাবে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের (টি.সি.এইচ) পরিমাণ দৃষ্টিকটুভাবে স্বাভাবিকের থেকে কম।
চিকিৎসা দরকার অবিলম্বেই।
ভদ্রমহিলা আমাকে অবাক করে বললেন থাইরয়েডের চিকিৎসা তো তিনমাস ধরেই চলছে। তাও কমছে না। শুনে ঈষৎ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, কি চিকিৎসা চলছে, প্রেসক্রিপশনটা দেখান।
এরপর আমাকে আরও অবাক করে ভদ্রমহিলা বের করলেন হাইপোথাইরয়েডের রোগীর জন্য বহুল ব্যবহৃত থাইরক্সিন হরমোনের সাপ্লিমেন্টের একখান ছোটো বোতল।
রিপোর্ট অনুযায়ী উনি ভুগছেন থাইরক্সিন হরমোনের আধিক্যজনিত অসুখে। আবার চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করছেন সেই থাইরক্সিন হরমোনেরই ট্যাবলেট। অর্থাৎ কিনা একরকম যার জন্য ভুগছেন সেটাই আবার শরীরে প্রয়োগ করে চলেছেন। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, কোন ডাক্তারবাবু দিয়েছেন এই ওষুধ?
উত্তর এলো, পাড়ার এক ভুঁইফোঁড় চিকিৎসক।
হা হতোস্মি! চমকে উঠলাম আমি।
আমার পাঁচ বছরের এমবিবিএস, দু বছরের ডিপ্লোমা, তিন বছরের এম ডি ডিগ্রি মুহূর্তেই যেন ফিকে হয়ে এলো উনার মুখের দিকে তাকিয়ে। উনার বাড়ি থেকে ডেবরা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের দূরত্ব মেরেকেটে ক্রোশ খানেক। উনি লাইন দিয়ে সময় নষ্ট করে সুচিকিৎসার সুপরামর্শ নেওয়ার থেকে অপচিকিৎসাকেই সযত্নে বেছে নিয়েছেন সানন্দে।
কথা না বাড়িয়ে কার্বামিজোল আর বিটা ব্লকার সহযোগে প্রেসক্রিপশন লিখে দিলাম উনাকে।
দিন পনেরো পরে ফিরে এলেন আবার। এবার আর হাতের কাঁপুনি নেই। ধড়ফড়ানি উধাও।নপালস, ব্লাড প্রেসারও স্বাভাবিক। থাইরয়েডের আল্ট্রাসাউন্ডও খুব অস্বাভাবিক নয়। গলার ফোলা আর চোখের বিস্ফারিত ভাব আগের থেকে একটু যেন কমেছে। ঘামও কমেছে।
আমার চিকিৎসার পরে উনি সেই ভুঁইফোঁড় চিকিৎসকের কাছেও গেছিলেন। তিনি কপট আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁর করা ভুল চিকিৎসার তত্ত্বে চপেটাঘাত করে বলেছেন-পছন্দ না হলে হাসপাতালে লাইন দিয়ে দেখান।
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বাঙালির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রইলাম।












আমার অবস্থাও ঐ ভদ্র মহিলার মতোই। তবে আমি কোন হাতুড়ে ডাক্তারের ঔষুধ সেবন করছি। লাইন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের থাইরয়েড ডাক্তারদের পরামর্শে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টার থেকে TSH, FT3, FT4 এবং usg of thyroyed টেস্ট করেছি। তারা রিপোর্ট দেখে আমাকে ৯/১/২০২৫ তারিখে অত্র মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। তারা আরো টেস্ট যেমন CBC, F. LIpid frofile, TRAB, thyroyed scan করতে বলেছেন। এজন্য তারা এখন শুধু আমাকে ৪ বার indever 20mg খেতে বলেছেন। রিপোর্ট দেখে পরবর্তী