Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

জালিওয়ানালা বাগ – ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশের শেষের শুরু

genocide r
Dr. Jayanta Bhattacharya

Dr. Jayanta Bhattacharya

General physician
My Other Posts
  • December 9, 2025
  • 8:42 am
  • 5 Comments

(ডেইলি মেল সংবাদপত্রে ১৪ মার্চ ১৯৪০-এ প্রকাশিত খবর। ছবিতে বিনা বাধায় ধৃত উধম সিং-কে দেখা যাচ্ছে)

(১৪ মার্চ, ১৯৪০-এ ডেইলি হেরাল্ড সংবাদপত্রের শিরোনাম)

রবীন্দ্রনাথের চিঠি দিয়ে আমার আলোচনায় প্রবেশ করি। রবীন্দ্রনাথের লেখা এই চিঠিটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুবিদিত। তৎকলীন অবিভক্ত পাঞ্জাবের জালিওয়ানা বাগ-এ কোন প্ররোচনা ছাড়া জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং লেফটন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডায়ারের পূর্ণ সমর্থনে নিরীহ ভারতীয়দের ওপরে নারকীয় হত্যালীলার প্রলয়কাণ্ড চালানোর পরে তৎকলীন ভারতের ভাইসরয় চেমসফোর্ডকে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড খেতাব ফিরিয়ে দিয়ে এই চিঠিটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ৩ জুন, ১৯১৯-এ স্টেটসম্যান এবং জুলাই, ১৯১৯-এ মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ছাপা হয়। নীচে চিঠিটির মুল ইংরেজি এবং বাংলা তর্জমা দিলাম। ইংরেজি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের শিরোনামের একটি ছবিও নীচে দেওয়া হল।

Your Excellency,

The enormity of the measures taken by the Government in the Punjab for quelling some local disturbances has, with a rude shock, revealed to our minds the helplessness of our position as British subjects in India. The disproportionate severity of the punishments inflicted upon the unfortunate people and the methods of carrying them out, we are convinced, are without parallel in the history of civilised governments, barring some conspicuous exceptions, recent and remote. Considering that such treatment has been meted out to a population, disarmed and resourceless, by a power which has the most terribly efficient organisation for destruction of human lives, we must strongly assert that it can claim no political expediency, far less moral justification.

The accounts of the insults and sufferings by our brothers in Punjab have trickled through the gagged silence, reaching every corner of India, and the universal agony of indignation roused in the hearts of our people has been ignored by our rulers-possibly congratulating themselves for what they imagine as salutary lessons. This callousness has been praised by most of the Anglo-Indian papers, which have in some cases gone to the brutal length of making fun of our sufferings, without receiving the least check from the same authority-relentlessly careful in smothering every cry of pain and expression of judgement from the organs representing the sufferers.

Knowing that our appeals have been in vain and that the passion of vengeance is blinding the nobler vision of statesmanship in our Government, which could so easily afford to be magnanimous as befitting its physical strength and moral tradition, the very least that I can do for my country is to take all consequences upon myself in giving voice to the protest of the millions of my countrymen, surprised into a dumb anguish of terror. The time has come when badges of honour make our shame glaring in the incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of those of my countrymen, who, for their so-called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings.

These are the reasons which have painfully compelled me to ask Your Excellency, with due reference and regret, to relieve me of my title of Knighthood, which I had the honour to accept from His Majesty the King at the hands of your predecessor, for whose nobleness of heart I still entertain great admiration.

Yours faithfully,
Rabindranath Tagore

Calcutta,
6, Dwarakanath Tagore Lane, May 30, 1919

বেশ খানিকটা দুর্বল বাংলা তর্জমা এরকম –

মহামান্য,

পাঞ্জাবে সরকার কর্তৃক স্থানীয় উত্তেজনা দমন করার জন্য যে ধরণের নিষ্ঠুর অত্যাচার মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে ব্রিটিশ শাসনাধীন রাষ্ট্রে প্রজাদের অসহায়ত্বের পরিচয় ফুটে উঠেছে। সুনির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়া, যেভাবে অসহায় মানুষগুলোকে নির্যাতন করা হয়েছে, যেভাবে তাদেরকে তুলে নেয়া হয়েছে, তা অতি নিন্দনীয়। কোন সভ্য দেশে সম্প্রতি বা অতীতে এই ধরণের বর্বরোচিত ঘটনা কোথাও ঘটে নি। নিরস্ত্র, অসহায় মানুষদের প্রতি যে ধরনের দমন নিপীড়ন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে এই সরকার নাগরিকেদের জীবনমান ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এই ধরণের কর্মকাণ্ড কোন নৈতিক বিচারের মাপকাঠিতে দাঁড় করানো তো দূরের কথা, কোন ধরণের রাজনৈতিক বিবেচনায় পড়ে না। আমাদের পাঞ্জাবভাইদের প্রতি যে ধরণের অবর্ণনীয় নীরব কষ্ট, অপমানের আর্তনাদ ভারতের কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে। পুরো বিশ্ব এই ধরণের হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে – কিন্তু আমাদের সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। মনে হচ্ছে, এই সরকার এই বিশাল কাজের জন্য নিজেরদেরকে অভিবাদন জানাচ্ছে। বেশির ভাগ অ্যাংলো ইন্ডিয়া পত্রিকায় এই ধ্বংসযজ্ঞকে প্রশংসা করা হয়েছে। অথচ, কর্তৃপক্ষ থেকে কোন ধরণের ব্যবস্থা তো দুরের কথা একবার কেউ সেখানে পরিদর্শনেও আসে নি। আমাদের কষ্টকে নিয়ে কি ধরণের নির্মম তামাশা করা হচ্ছে তার প্রমান হচ্ছে এইগুলো। আমরা জানি, প্রতিহিংসাপরায়ন, শাসকক্ষমতাধরদের কাছে এই ধরণের আবেদন নিরর্থক। অথচ ন্যায় বিচার দ্বারা শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, মহিমান্বিত করা যেত। সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সত্যিই অবাক করার মতন। কিন্তু এই ধরণের পরিস্থিতিতে, দেশের মানুষদেরকে রক্ষার জন্য আমিও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অসামঞ্জস্য মানহানিকর এরকম পরিস্থিতিতে এই ধরণের সম্মান সতি লজ্জাজনক। আমি আমার নির্যাতিত দেশবাসীর পক্ষ থেকে এই ধরনের অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

উপরোক্ত কারণে আমার জন্য প্রদান করা মহানুভব রাজার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্মানীয় খেতাব নাইটহুড উপাধি বহনের ভার থেকে আমাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হোক, এই প্রার্থনা জানাচ্ছি। আপনার পূর্বসূরির এই ধরণের মহানুভবতার জন্য আমি এখনো আপনাকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই।

আপনার বিশ্বস্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কলকাতা, ৬, দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, মে ৩০, ১৯১৯

কিন্তু এ এক পরিহাস – নিয়তির কিংবা ঐতিহাসিক – এখনকার জালিওয়ানালাবাগ স্মৃতি উদ্যানে রবীন্দ্রনাথের কোন চিহ্নমাত্র নেই। এমনকি একটি আবক্ষ মূর্তিও।[1] উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার পাঠ্যক্রম থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে রামদেবকে (যোগগুরু) অন্তর্ভুক্ত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ।

রবীন্দ্রনাথের চিঠির নেপথ্য কাহিনি

ভয়, হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া ভয়। আজ থেকে শতবর্ষ আগে ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করে বসে থাকা ইংরেজ শাসকের মনে ভয় ভর করেছে তখন। সাম্রাজ্য হারানোর ভয়, উপমহাদেশের শোষিত জনতার শক্তি কবে একত্রিত হয়ে তাঁদের গদিছাড়া করে, সেই ভয়। যথারীতি এই ভয় কমাতে সে সময় মরিয়া হয়ে উঠল ইংরেজ প্রশাসন। তারা ভাবছিল, ‘নেটিভ’ জনসাধারণকে আগাপাছতলা স্বৈরাচারী আচরণ দিয়ে কী করে শায়েস্তা করা যায়। কীভাবে তাদের ভুলিয়ে দেওয়া যায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথা। এ সময় ইংরেজদের সুবিধা করে দিতে জনতার ওপর অত্যাচার ও ভয়ানক নির্মমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়ে ১৯১৯ সালের ১০ মার্চ বলবৎ করা হয় কুখ্যাত ‘রাওলাট অ্যাক্ট’।

এমনই এক সময়ে নানা ঘটনা পরিক্রমায় পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল (সেদিন রবিবার ছিল) ডাকা হলো এক প্রতিবাদসভা। স্থান নগরীর বিরাট জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যান। সেদিন আবার ছিল পাঞ্জাবের অন্যতম বৃহৎ উৎসব বৈশাখীরও দিন। আইনের ছলাকলা দেখিয়ে তখন পাঞ্জাবে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ হলেও সাতসকালেই উদ্যান ভরে গেল উৎসাহী ক্রোধতপ্ত মানুষে।

ইংরেজ সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারের (Reginald Dyer) নির্দেশে মুহূর্তেই গুলি ছুটল প্রতিবাদী জনসমষ্টির দিকে। সরকারি হিসাবে মারা গেল ৩৭৯ জন কিন্তু ধারণা করা হয়, আসল সংখ্যা এর থেকেও ঢের ঢের বেশি। উৎসব-আনন্দের বৈশাখী মুহূর্তেই পরিণত হলো ‘খুনি বৈশাখীতে’। এর পেছনে পাঞ্জাবের দুঃশাসক লেফটন্যান্ট গর্ভনর মাইকেল ও’ডায়ারের (Michael O’Dyer) ভূমিকাও ছিল নৃশংস। রেগিনাল্ড ডায়ারের নরমেধ যজ্ঞের প্রত্যক্ষ মদতদাতা। [উচ্চারণ কাছাকাছি হলেও Reginald Dyer এবং Michael O’Dyer-কে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।]

কিন্তু এমন এক বর্বর হত্যাযজ্ঞের খবর উপমহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে তখনই পারল না। পাঞ্জাব জুড়ে জারি করা হয়েছিল জরুরি অবস্থা। আর সংবাদপত্রের ওপর ইংরেজ সরকারের নানা সেন্সরশিপ তো বহাল ছিলই। পাঞ্জাব থেকে বহু দূরের বঙ্গদেশে জালিয়ানওয়ালাবাগের খবর এল তাই দেরিতে। হত্যালীলার কিছুদিন পর নানা ছায়া-আবছায়াময় বাস্তব ও গুজবে মেশানো ছিন্নভিন্ন আকারে প্রকাশ্য হতে শুরু করল। কিন্তু তা থেকে তখনো পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোটা আঁচ করা সম্ভব ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কানেও যথারীতি এ খবর সম্পূর্ণ আকারে আসছিল না। ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও শান্তিনিকেতনের শিক্ষক সি এফ অ্যান্ডরুজ তখন শান্তিনিকেতন থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন। তিনি একাধারে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন বটে। দিল্লি ছাড়াও সিমলা ঘুরে এসে তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের ন্যক্কারজনক ঘটনা সম্পর্কে কিছু খবর পেয়েছিলেন।

১৯১৯ সালের পয়লা মে লেখা এক চিঠিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানান, ‘অসহায় গ্রামবাসীর ওপর এয়ারপ্লেন বোমা ফেলছে আর কেবল লাঠি হাতে থাকা জনসমাবেশে মেশিনগান গুলি ছোটাচ্ছে।’ চিঠি গোয়েন্দাদের হাতে পড়তে পারে, এমন শঙ্কায় অ্যান্ডরুজ আর বেশি কিছু লিখতে পারেননি। অ্যান্ডরুজ এরপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অমৃতসর যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাঁকে ট্রেনেই গ্রেপ্তার করে দিল্লি পাঠিয়ে দেয়। এ ঘটনা পরে জেনে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মর্মাহত হন, ওই সময়ের দুশ্চিন্তা ও রাগের প্রকাশ দেখা যায় ২২ মে ১৯১৯ সালে কিশোরী রানু অধিকারীকে লেখা এক চিঠিতে: ‘তোমরা তো পাঞ্জাবে আছ, পাঞ্জাবের দুঃখের খবর বোধ হয় পাও। এই দুঃখের তাপ আমার বুকের পাঁজর পুড়িয়ে দিলে।…’ ২২ মে তারিখেই রবীন্দ্রনাথ আসেন কলকাতায়। মনের মধ্যে ক্ষোভ আগুনের মতো জ্বলছে, তা সত্ত্বেও বহিরঙ্গে নিজের কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা তিনি করে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু একটা সময়ের পর আর পারলেন না। কথাবার্তা কমে যায় ও লেখালেখি বন্ধ করে দেন। মুখে হাসি নেই। শরীরও ক্ষোভে-রাগে খারাপের দিকে যাচ্ছিল। এমন সময় তাঁর মাথায় একটি প্রতিবাদের পরিকল্পনা আসে। তখন পাঞ্জাবে অন্য এলাকার বাসিন্দাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে ব্রিটিশ সরকার। রবীন্দ্রনাথের মনে হয়, মহাত্মা গান্ধী আর তিনি মিলে প্রথমে দিল্লি গিয়ে তারপর যদি পাঞ্জাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাহলে একটা বড় প্রতিবাদ হয়। যদি তাঁদের ইংরেজ প্রশাসন গ্রেপ্তার করেও, তাতে প্রতিবাদের ও জনমনের প্রতিক্রিয়ার স্ফুলিঙ্গ আরও শক্তিশালী হবে। অতঃপর এই প্রস্তাবে গান্ধী রাজি হবেন কি না, তা জানতে তাঁর কাছে পাঠালেন সি এফ অ্যান্ডরুজকে। অ্যান্ডরুজকে গান্ধী ‘না’ বলে দেন এই বলে, ‘আমি এখনই সরকারকে বিব্রত করতে চাইছি না।’ ফিরে এসে অ্যান্ডরুজ যখন এ কথা রবীন্দ্রনাথকে জানালেন, কবি স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তবে হতোদ্যম হননি।

গান্ধীকে যখন সঙ্গে পেলেন না, তখন স্বভাষী রাজনীতিবিদ চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর পাশে দাঁড়াবেন—এমনটা তিনি ভেবেছিলেন। তাই ২৯ মে বিকেলবেলা নিজেই যান তাঁর কাছে। কিন্তু গান্ধীর মতো তিনিও কবিকে হতাশ করেন। চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে কী আলাপ হয়েছিল, সেই বয়ান তিনি পরে জানান প্রশান্তকুমার মহলানবিশকে এভাবে: ‘মহাত্মাজী রাজি হলেন না পাঞ্জাবে যেতে। কাল তাই নিজেই গিয়েছিলুম চিত্তরঞ্জনের কাছে। বললুম যে, এই সময় সমস্ত দেশ মুখ বন্ধ করে থাকবে তা অসহ্য। তোমরা প্রতিবাদসভা ডাকো।’ এ কথা শুনে চিত্তরঞ্জন দাশ সভা করার দায় ঘাড়ে নিতে চাননি। উল্টো রবীন্দ্রনাথ একাই একটা সভায় প্রতিবাদী বক্তব্য রাখবেন—এমন প্রস্তাব দেন তিনি। এ কথা স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের মনঃপূত হয়নি। তাঁর মনে হয়েছিল, যদি একাই কিছু করতে হয়, তবে লোক ডেকে জড়ো করা কেন? অন্তরে বিপুল বেদনা ও রাগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ওই দিনই সিদ্ধান্ত নেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করে বড়লাটকে চিঠি লিখবেন। সারা রাত জেগে সেই ঐতিহাসিক চিঠির মুসাবিদা চলল। যখন ভোরের আলো ফুটছে, তখন লেখা শেষ হলো। প্রশান্তকুমার মহলানবিশ সে সময় ছিলেন কবির কাছেই। ওই সময় কবি তাঁকে বলেছিলেন, “এই সম্মানটা ওরা আমাকে দিয়েছিল। কাজে লেগে গেল। এটা ফিরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ করে আমার কথাটা বলবার সুযোগ পেলুম।” ভোর শেষে সকাল হলে অ্যান্ডরুজ এলেন চিঠিটা নিতে। সেই সময় ঘটেছিল আরেক কাণ্ড। রবীন্দ্রনাথের ক্রোধতপ্ত চিঠির ভাষা খানিক নরমসরম করা যায় নাকি, এমন প্রস্তাব ছিল অ্যান্ডরুজের। এ কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।

 

(জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ইংরেজ সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ার)

(অমৃতসরের একটি রাস্তায় মোতায়েন ভারতীয় পুলিশ – একজন শিখও আছে)

নাইটহুড পরিত্যাগের এ চিঠি গোটা বাংলা তো বটেই, দেশজুড়েই আলোড়ন তুলল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার এই, ওই রকম একক ও সাহসী প্রতিবাদের পরও রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে নানা নিন্দা-মন্দ প্রচার হতে শুরু করে। যেমন, ৩ জুন তারিখে নায়ক নামের এক পত্রিকা সম্পাদকীয়তে লেখে, ‘রবীন্দ্রনাথ উপাধী বর্জ্জন করিয়া নিজের সুবিধা কি করিয়াছেন তাহা জানি না, দেশের ও জাতির যে কোন সুবিধা করতে পারেন নাই, তাহা বলিবই। আমরা তাঁহার কার্য্যরে সমর্থন করিতে পারিলাম না।’ স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও একটি ব্যক্তিগত পত্রে রবীন্দ্রনাথের এই ‘জ্বলন্ত’ চিঠিকে ‘অকালপক্ক’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে চলতে থাকে আরেক খেলা, ইংরেজ কর্তৃপক্ষের তরফে কয়েকজন রবীন্দ্রনাথের উপাধি ফেরত নিতে অক্ষম বলে নিজেদের দাবি করে কিছু চিঠিপত্র কবির কাছে চালাচালি করেন। সম্ভবত এই ছলচাতুরির উদ্দেশ্য ছিল কবিকে বিভ্রান্ত করা। কিন্তু কবি নিজের অবস্থানে ঠিকই অটুট থাকেন। বস্তুত নামের সামনে থেকে ইংরেজি ‘স্যার’-এর লেজুড়টুকু মুছে ফেলতে পেরে তিনি অনেকটা শান্ত হতে পেরেছিলেন। মনের বোঝা নামিয়ে লেখালেখিতেও তিনি দ্রুত ফিরে আসতে পারেন নাইটহুড উপাধি ত্যাগের পরই।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞের পর পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতিবিদেরা যখন চুপচাপ থাকার পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেখানে নাইটহুড বর্জনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের একক প্রতিবাদ এই বর্বরতার দিকে বিশ্ববাসীর চোখ ফেরাতে পেরেছিল। তবে রবীন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পাল্টা সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার সপক্ষে ছিলেন না। তাই মনে হয় জালিয়ানওয়ালাবাগের ২১ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ লন্ডনে হত্যাকাণ্ডের মূল দুই হোতার একজন মাইকেল ও’ডায়ারকে হত্যা করেছিলেন যে বিপ্লবী উধম সিং (পরে ইংরেজ সরকার দ্রুত তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলায়), তাঁর প্রতি রবীন্দ্রনাথ সহানুভূতি নিশ্চয়ই রাখতেন, কিন্তু প্রশংসা করতে পারতেন না।[2] এ প্রবন্ধের প্রথম ছবিতেই ঘটনাটির খবর দিয়েছি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

আমেরিকার নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রে ১৯২০ সালের ২৬ মে তারিখে (পৃঃ ৬) এই শিরোনামে জালিওয়ানালা বাগ সংক্রান্ত ওপরের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানে “slaughter” তথা ব্যাপক নরহত্যা শব্দটি লক্ষ্যণীয়। সংবাদপত্রের লন্ডন প্রতিনিধি ২৫ মে তারিখে রিপোর্টটি পাঠিয়েছিলেন। আমরা ওপরের অংশটুকু নজর করলে বুঝবো, যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সেটা “Minority Report”। এই “Minority Report” আসলে কী?

জালিওয়ানালা বাগ হত্যাকাণ্ডের পরে দেশব্যাপী – রবীন্দ্রনাথ থেকে গান্ধী, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস থেকে ্ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আসমুদ্র হিমাচল – ভারতবর্ষে প্রতিবাদের ঢেউ লন্ডনের “গণতান্ত্রিক” শাসকদের বাধ্য করে স্কটিশ হাই কোর্ট জজ লর্ড হান্টারের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি (Committee of Enquiry) গঠন করতে। কমিটির ৭ জন সদস্যের মধ্যে ৪ জন – জাস্টিস এইচ সি র‍্যানকিন, ভারত সরকারের অতিরিক্ত সেক্রেটারি ডবল্যু এফ রাইস, মেজর জেনারেল জর্জ ব্যারো, সংযুক্ত প্রদেশের লেফটন্যান্ট গভর্নরের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য টমাস স্মিথ – ছিল খোদ ব্রিটিশ প্রতিনিধি। বাকি ৩ জন – সংযুক্ত প্রদেশের লেফটন্যান্ট গভর্নরের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য পণ্ডিত জগৎ নারায়ণ, বোম্বে হাইকোর্টের আইনজীবী হরিলাল শেতালবাদ এবং গোয়ালিয়র রাজ্যের “Member of Appeals”-এর সদস্য সর্দার সাহিবিজাদা সুলতান আহমেদ খান – ছিলেন ভারতীয়দের প্রতিনিধি এবং সংখ্যায় লঘিষ্ঠ। এবং এ কারণে “Minority Report”-এর প্রসঙ্গ এসেছে। ভারতীয়দের রিপোর্টের সুর ছিল কড়া।[3]

এখানে একটু জোর দিয়ে দিয়ে উল্লেখ করা দরকার, ভারতের এই ঘটনার খবর আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের মধ্যে এবং, বিশেষ করে, ভারতের বাইরে পৌঁছতে অনেকটা সময় লেগেছিল তৎকালীন ভারতে বলবৎ বিভিন্ন সামরিক এবং অসামরিক কঠোর নিষেধাজ্ঞার জন্য – “The outside world has never had the slightest conception of the feeling in April 1919”[4]।

এমনকি প্রশান্ত কুমার পালও মন্তব্য করেছেন – “সামরিক কর্তৃপক্ষ সংবাদ প্রকাশ ও প্রেরণের উপরেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে পাঞ্জাব বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।”[5]

পাল এ মন্তব্যও করেছেন – “পরে তদন্তকারী হান্টার কমিশনের সামনে উদ্ধত ডায়ার বলে, সংকীর্ণ পথের কারণে অস্ত্রবাহী গাড়ি আনা যায়নি ও গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে মৃতের সংখ্যা এত কম, নইলে উচিওত শিক্ষা পেত আন্দোলনকারীরা … অভূতপূর্ব সব শাস্তির পরিকল্পনা করা হয় – তার মধ্যে মাটিতে নাক ঘষা, হামাগুড়ি দিয়ে চলা, সারাদিন গ্রীষ্মসূর্যের রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে রাখা, জনসমক্ষে চাবুক মারা, যে-কোনো য়ুরোপীয়কে দেখলেই বাধ্যতামূলক সেলাম প্রভৃতিও ছিল।”[6]

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জালিওয়ানালা বাগ নরমেধ যজ্ঞের ১০০ বছর পরে পূর্বোক্ত নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ (জুন ২৫, ২০১৯) একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল “Twenty Years After a Brutal Massacre, It’s Payback Time” শিরোনামে। সে প্রতিবেদনে বলা হয় – “more than 15,000 Indians had gathered for a peaceful protest against the increasingly restrictive policies of the British government, and in particular the deportation of two followers of Gandhi. At the orders of Brig. Gen. Reginald Dyer, the soldiers began firing into the crowd without warning. When screaming men, women and children rushed toward the exits, Dyer ordered his troops to aim at them. Many who were attempting to climb over the high perimeter wall were gunned down, their bloodied bodies falling in heaps. The firing went on for 10 minutes, killing an estimated 500 to 600 people and wounding many more. While Dyer was the one to order the killings, another man was also responsible for the massacre: Michael O’Dwyer, the lieutenant governor of Punjab, who justified the carnage and defended Dyer’s actions.”[7]

জালিওয়ানালা বাগ-এর মূল ঘটনা এবং তার আগের সময়

বাগ মানে বাগান। এজন্য জালিওয়ানবাগের স্থানীয় নাম ছিল “জাল্লার বাগান”। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরের কাছেই ছিল এর অবস্থান, এখনও আছে। প্রধানত বিভিন্ন মেলা বা জমায়েতের জন্য এ স্থানটি ব্যবহার করা হত। বিশিষ্ট উদারপন্থী ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড টমসন বলেছেন – “a dreary eight-acre expanse. It is sunk below the level of Amritsar, in a nest of tortuous streets. You enter by a very narrow passage, opening on to the platform where General Dyer’s tiny force of Gurkhas and Baluchis deployed.”[8]

এখানে লক্ষ্য করার মতো – (১) অমৃতসর শহরের চেয়ে খানিকটা নীচু অবস্থানে ছিল এই বাগানটি; (২) সরু, অপ্রশস্ত আঁকাবাঁকা গলি গিয়ে মিশেছিল “জাল্লার বাগান”-এ; (৩) ডায়ার খুব লক্ষ্যণীভাবে কোন ব্রিটিশ সেনা রাখেন নি। কিন্তু যারা ছিল তারা সবাই অভারতীয়।[9] অভারতীয় সেনাদের – গোর্খা এবং বালুচি – মোতায়েন করা হয়েছিল, যাদের সাধারণ ভারতবাসী সম্পর্কে স্বভাবিকভাবেই কোন আবেগ বা সহমর্মিতা থাকার কথা নয়।

জালিওয়ানালা বাগের ১০০ বছর পূর্তিতে অনিতা আনন্দ মাইকেল ও’ডায়ারের প্রাণ-নেওয়া বীর উধম সিং ওরফে রাম মোহম্মদ সিং আজাদ-কে নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থ The Patient Assasin: A True Tale of Massacre, Rvenge and the Raj (২০১৯)-এ বলেছেন ভারতীয়রা ছিল “the leeser humans” – মনুষ্যেতর জীব।

(জালিওয়ানালা বাগ নরমেধ যজ্ঞের অব্যবহিত আগে তোলা সরু গলির ছবি। তখন মার্শাল ল জারি হয়েছে।)

৯ এপ্রিল, ১৯১৯ (রবিবার) বৈশাখি পূর্ণিমার দিনে (আবার ১৬৯৯ সালের এই দিনে শিখদের ১০ম গুরু গুরু গোবিন্দ সিং খালসা পন্থার সূচনা করেন) এই নরমেধ যজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণের আগে আরও কিছু ঘটনার – যেগুলো পরে আলোচনা  করবো – উল্লেখ থাকা দরকার। ১৯১৫-তে ভারতের সুরক্ষার জন্য গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট জারি হয়েছিল। তারপরে এলো কুখ্যাত রাওলাট আইন। শুরু হল গান্ধিজির ডাকে সারা ভারতব্যাপী সত্যাগ্রহ আন্দোলন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন অনেক জায়গাতেই সহিংস চেহারা নিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ করে নজরে রাখার মতো বিষয় ছিল হিন্দু-মুসলমান-শিখ ঐক্য। কয়েকটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য – (১) লাহোরে বাদশাহি মসজিদকে হিন্দু-মুসলমান জনগণের সম্মিলিত মিটিংযের জন্য ব্যবহার করা হত, (২) গুজরানওয়ালাতে মসজিদের সামনে শুয়রের মাংস এবং মন্দিরের সামনে গরুর মাংস পাওয়া গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধেনি। সবাই জানতো এটা পুলিশের কাজ।[10]

আজকের ভারতবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে কেমন লাগবে? এমনকি আমাদের পশ্চিমবঙ্গও।

আমরা স্মরণে রাখবো, উধম সিং যিনি ২১ বছর ধরে জালিওয়ানালা বাগ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেবার জন্য বুকের মাঝে “বজ্রমাণিক দিয়ে গাঁথা” পবিত্র আগুনকে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন এবং ডায়ারকে না পেয়ে ডায়ারের সমধর্মী হিংস্র সেসময়ের জলন্ধরের লেফটন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডায়ারকে ইংল্যান্ডের ক্যাক্সটন হলে হত্যা করেছিলেনে, তিনি তাঁর নিজের নাম রেখেছিলেন রাম মোহম্মদ সিং আজাদ। নামের প্রথম ৩টি শব্দ যথাক্রমে হিন্দু-মুসলিম-শিখ পরিচয় বোঝায়, আবার শেষে ব্যবহৃত আজাদ শব্দের অর্থ স্বাধীনতা।

যাহোক আমরা নরমেধ যজ্ঞের প্রসঙ্গে এবং হিন্দু-মুসলমান-শিখ ঐক্যের ক্ষেত্রে ফিরে আসি। ৩১ মার্চ, ১৯১৯ – সন্ধেবেলাতে দিল্লিতে সাধারণ মানুষের রক্তে স্নাত হল রাস্তা, পুলিশের গুলিতে। পাঞ্জাবের মানুষের মনে এ ঘটনা আগুন জ্বালিয়ে দিল। ৪ এপ্রিল, ১৯১৯-এ প্রকাশিত বোম্বে ক্রনিকল-এ ছাপা হল নীচের খবরটি।[11]

(বিশেষ করে আজকের ভারতবর্ষে এই প্রতিবেদনটির গুরুত্ব অপরিসীম)

৬ এপ্রিল অমৃতসর থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে আইনঅমান্য আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়ে নীচের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।

একজন সুবিদিত ঐতিহাসিকের বর্ণনায় – “বছরের এই সময়ে এই মাঠ শুকনো থাকতো, চারপাশ ঘেরা স্থানীয় বাড়িঘরের উঁচু দেওয়াল দিয়ে। এটা প্রায় ২০০ গজ মতো লম্বা এবং প্রায় সম পরিমাণ চওড়া। এতে ৫টি সরু প্রবেশ পথ এসে মিশেছিল … এই রাস্তাগুলোর পাশে ছিল আবর্জনাবাহী নালা। মাঠের মাঝখানে ছিল একটি ছোট গম্বুজাকৃতি সমাধি এবং একটি বৃহৎ কুয়ো, প্রায় ২০ মিটার ব্যাসের এবং গভীরে ২০ মিটার নীচে জল।”[12]

১৩ এপ্রিল, ১৯১৯-এ অমৃতসর শহরে মার্শাল ল জারি ছিল। শহরের সমস্ত জমায়েতের জায়গায় এই আইনের ধারাগুলো একজন নায়িব-ই-তহশিলদার ইংরেজি এবং উর্দুতে এর বয়ান পড়ে শোনাচ্ছিল। তবে পাঞ্জাবি এবং হিন্দিতে অনুবাদ করে দিত। মার্শাল ল-র ২টি ধারা গুরুত্বপূর্ণ।

১ নম্বর ধারা – অমৃতসর শহরে বসবাসকারী কোন মানুষ রাত ৮টার পরে রাস্তায় বেরোবে না। রাস্তায় দেখা গেলে গুলি করা হবে।

২ নম্বর ধারা ছিল – কোন ধরনের জমায়েত বা মিছিল শহরের কোন অংশে করা যাবেনা। সম্পূর্ণত নিষিদ্ধ। এসমস্ত কাজকে বেআইনি কাজ বলে গণ্য করা হবে এবং, প্রয়োজনে, বলপ্রয়োগ করে ছত্রভঙ্গ করা হবে।[13]

কিন্তু এসব সত্ত্বেও হাজারে হাজারে মানুষ পূর্বঘোষিত বিকেল ৪.৩০-এর প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেবার জন্য জালিওয়ানালা বাগের পথে রওনা দেয়। এই মানুষদের মাঝে সাদা পোষাকে মিশে ছিল সিআইডি ইন্সপেক্টর জবাহর লাল – একজন আদ্যন্ত ভারতীয়। বাগের দিকে মুখ করা একটি বাড়ির সামনের অংশে ৩ জন পুলিশ ছিল। প্লেন আকাশে কয়েকবার চক্কর কেটেছিল। কোলেট-এর মন্তব্য – “ডায়ারের পরিকল্পনা হঠাৎ করে পরিস্থিতির চাপে তৈরি হয়নি।”[14]

৫৪তম শিখ এবং ৫৯তম সিন্ধ রাইফেলসের সামরিক বাহিনীকে এখানে মোতায়েন করা হয়, যথেষ্ট পরিমাণ বুলেট সহ রাইফেল দিয়ে। গোর্খাদের কাছে কুকরি ছিল। কিন্তু “Dyer was nervous of the potential for causing another backlash such as the city had suffered on the 10th.”[15]

কী ঘটেছিল ১০ এপ্রিল তারিখে? ৯ এপ্রিল মাইকেল ও’ডায়ার পাঞ্জাবে যাতে কোন অসুবিধে না হয় সেজন্য আদেশ দিয়েছিলেন ডাঃ সত্যপাল[16] এবং ডঃ সৈফুদ্দিন কিচলু-কে[17] গ্রেফতার করে পাঞ্জাবের অন্যত্র পাঠানোর জন্য। এরা, বিশেষ করে রাওলাট আইনের প্রতিবাদে, অমৃতসর এবং পাঞ্জাবের মানুষকে কুশলতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে গান্ধির দেখানো পথে সত্যাগ্রহ এবং নিরস্ত্র প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত করেছিলেন।

(ডাঃ সত্যপাল)

(ডঃ কিচলু)

১০ এপ্রিল, ১৯১৯-এ ডেপুটি কমিশনারের বাড়িতে এঁদের দু’জনকে ডেকে পাঠানো হয়। এখানে তাঁদেরকে গ্রেফতার করে গাড়িতে করে ধর্মশালায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে মাইকেল ও’ডায়ার সিদ্ধান্ত নেন গান্ধিজিকে দিল্লি কিংবা অমৃতসরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবেনা। গান্ধিজি অমৃতসরে আসছিলেন। অমৃতসরের আগে পালওয়াল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে বোম্বেগামী ট্রেনে চড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন দেশবাসীর প্রতি গান্ধিজির বার্তা ছিল – “আমার অ্যারেস্টে ক্রুদ্ধ হবেনা। এবং এমন কিছু যেন করা না হয় যাতে আমাদের সংগ্রাম অসত্য কিংবা দ্বারা কলঙ্কিত হয়।”[18]

যে মুহূর্তে ডাঃ সত্যপাল এবং ডঃ কিচলুর গ্রেফতারের খবর শহরের মানুষের কাছে পৌঁছল সে মূহুর্তে শহরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল এবং বনধ পালন করা শুরু হল। সকাল ১১.৩০ নাগাদ দোকানপাট বন্ধ করার পরে দ্রুতই “Hall Bridge”-এ পৌঁছেছিল। ব্রিজের ও প্রান্তে তখন ঘোড়সওয়ার পুলিশ মোতায়েন। কোন প্ররোচনা ছাড়া ২ জন পুলিশ ঘোড়া থেকে নেমে জনতার ওপরে গুলি চালাতে শুরু করে। কয়েকজন ওখানেই মারা যায়, বহুসংখ্যক আহত হয়। এরপরে জনতা তাঁদের নেতৃত্বকে ছাড়াতে না পেরে এবং গুলি চালানোর কারণে ফুঁসে ওঠে। পুলিশ আবার গুলি চালায়। সবমিলিয়ে ২০ জন নিহত হয়, এবং আহতের সংখ্যা অনেক বেশি। এরপরে ক্রোধদগ্ধ জনতার একাংশ টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ করে, টেলিগ্রাফ অফিসারকে বাড়ি থেকে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। সেসময়ে একদল মিলিটারি অকুস্থলে এসে পৌঁছয়। একই সময়ে আরও একদল মানুষ রেলওয়ের মাল গুদাম আক্রমণ করে। স্টেশন মাস্টার কোনরকমে পালিয়ে যেতে পারলেও একজন গার্ড এদের হাতে নিহত হয়। ন্যাশনাল ব্যাংকে আরও ৩ জন ব্রিটিশ আক্রমণে নিহত হয়। লুঠপাটও চলে। চার্টার্ড ব্যাংকও আক্রান্ত হয়।

হন একজন ব্রিটিশ শিক্ষিকা (যিনি ৬০০ শিশুকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন) মিস শেরউড। যে গলিতে তিনি আক্রান্ত হন সে গলির নাম ছিল কুচা কুরিছান (বাংলায় এর অর্থ দাঁড়াবে “সমুদ্র স্রোত”, পরে এ বিষয়ে আলোচনা হবে)। কিন্তু এতসবের পরেও কী বলা যায় – জালিওয়ানালা বাগের মতো নরমেধ যজ্ঞ যথাযোগ্য ছিল?[19]

১১ এপ্রিল অমৃতসরে মার্শাল ল জারি হল। অমৃতসরের এক কলেজের প্রিন্সিপাল মিস্টার ওয়াথেন (Wathen) সামরিক কর্তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেবার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা এবং সংযম রক্ষা করতে বলেছিলেন।[20] কে কার কথা শোনে?

এসে গেল স্মরণীয়, ভারতীয় ইতিহাসের পালাবদলকারী সেই ঐতিহাসিক দিন ও মুহূর্ত। ডায়ার “আর্মার্ড” গাড়ি এবং মেশিন গান নিয়ে ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরু গলিতে এটা সম্ভব হয়নি। এজন্য মাঠের চেয়ে একটু উঁচু জায়গায় ডায়ারের দু’পাশে ২৫ জন করে সৈন্য রেখে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেন জমায়েতের ওপরে – তখন মিটিং চলছিল এবং একের পর এক বক্তা তাঁদের বক্তব্য রাখছিলেন। হিসেব বলে, ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো। অবশেষে গুলি শেষ হয়ে যাবার পরে – ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে গুলি চালানোর হয়েছিল – সৈন্যরা স্থান ত্যাগ করে।

সরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫৯, আহত ১০০০-এর বেশি। কিন্তু অন্য হিসেবেও আছে। কোলেট এক ব্রিটিশ রাজপুরুষকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছেন – “J. P. Thompson recorded a guess 800 to 1800 dead made by a colleague in the Punjab ICS, a Mr. Bayley, who visited Amritsar on 20 April 1919.”[21]

(১৯১৯ সালের অমৃতসর গণহত্যার চিত্রিত ম্যুরাল)

(জালিওয়ানালা বাগ নরমেধ যজ্ঞের চিত্র)

(বাড়ির গায়ে বুলেটের ক্ষত)

ইংল্যান্ডে নরমেধ যজ্ঞের বীভৎসতার খবর নিয়ে আলোড়ন শুরু হয়, তবে দেরিতে। উইনস্টন চার্চিল (পরে যিনি ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন) সেসময়ে অর্থাৎ ১৯২০ সালে ছিলেন “Secretary of State for War”। এ কথা সহজবোধ্য যে, তিনি যথেষ্ট ক্ষমতাশালী ছিলেন। তিনি এ অপরাধের স্পষ্টভাষায় নিন্দা করেন। কিন্তু ও দেশে ১৯২০ সালের মে মাসে মিলিটারি কমিশন ডায়ারকে নিয়ে রিপোর্টের খসড়া তৈরি করে। অনেক প্রস্তাবের মধ্যে ডায়ার-সংক্রান্ত যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেগুলো হল –

(১) তিনি নিশ্চিতভাবেই সবেচেয়ে সঠিক কাজটি যথেষ্ট সঙ্গত কারণেই করেছেন

(২) তিনি পরিস্থিতির মূল্যায়ন গভীর বিচারবোধ থেকে করেছিলেন

(৩) তিনি যথেষ্ট পরিমাণে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন

(৪) এটা ভাবা বিদ্রুপের সমতুল্য যে ওখানে কোন নিরীহ জমায়েত হয়েছিল

(৫) আগের ২ দিন এই উন্মত্ত জনতাই সমস্ত আইনকানুন নস্যাৎ করেছিল

(৬) ডায়ারকে অমানুষিকতার দায় থেকে স্খালন করা হোক

(৭) তাকে সমস্ত রকমের দোষারোপ এবং ভৎর্সনা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক

কোলেট লিখছেন – “Churchill naturally refused to accept this paper, and harangued the Army Council which met on 6 July, trying to persuade the Military Mmebers to bend to what he stated as the will of the Cabinet, but … unable to move them to accept his demand that Dyre be made to retire.”[22]

জালিওয়ানালা বাগ নরমেধ যজ্ঞের পরে

জালিওয়ানালা বাগে যে সহস্রাধিক মানুষকে খুন করা হয়েছিল তার মধ্যে ১টি ৬ মাসের শিশুও ছিল। জালিওয়ানালা বাগ হত্যাকান্ডের পরে যেসমস্ত ভয়ঙ্কর অমর্যাদাজনক শাস্তিগুলো পাঞ্জাব প্রদেশের (তখন অবিভক্ত পাঞ্জাব) ওপরে আরোপ করা হয়েছিল তার মধ্যে কয়েকটি হল –

(১) “The Crawling Order (Amritsar) – পেট এবং বুক দিয়ে হেঁটে যাওয়া। পূর্বোল্লিখিত কুচা কুরিছান গলি দিয়ে যারাই হেঁটে যেত তাদেরকে এভাবেই যেতে হত।

(২) “The Salaaming Order (Amritsar, Gujranwala) – রাস্তায় সাহেবদের দেখলেই সেলাম করতে হবে

(৩) সমস্ত পুরুষ মানুষকে রাস্তা ঝাড় দেওয়া এবং নোংরা পরিষ্কার করার কাজ করতে হবে

(৪) “Lawyaers made menials (Constable order in Amritsar)” – আইনজীবীদের কনস্টেবলের কাজ করতে হবে।

(৫) “Crops or shop inventories confiscated (Nawan Pind, Sheikhpura, Wazirabad)” – শস্য এবং মালপত্র বাজেয়াপ্ত করা হবে।[23]

এর সঙ্গে আরেকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আদেশ ছিল – সর্বজনীন স্থানে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরে বেত্রাঘাত করা হবে।

(জনসমক্ষে বেত্রাঘাত)

স্কুলের ছাত্রসহ শয়ে শয়ে মানুষকে অমৃতসর এবং লাহোরে এভাবে জনসমক্ষে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। তাদের অপরাধ? দু’জনে পাশাপাশি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কিংবা কোন ব্রিটিশ অফিসারকে সেলাম না করা। কসুর-এ (এখন পাকিস্তানের অন্তর্গত) নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে রাস্তার মধ্যিখানে খোলা খাঁচায় বন্দী করে রাখা হত।[24]

সিংহাবলোকন

জালিওয়ানালা বাগের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি অতি সংক্ষেপে বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে দেখতে হবে – যাকে সিংহাবলোকন বলে। কী সেই পটভূমি? সহজে বলার জন্য এবং সংক্ষিপ্ত করার জন্য আমি পরপর বিষয়গুলোকে সাজিয়ে দেবার চেষ্টা করছি।

(১) ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলল। ইংরেজ শেষ অব্দি বিজয়ী হল। পরাজিত হল জার্মানি। এই যুদ্ধে ১৩ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ ভারতীয়কে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি হিসেবে যুদ্ধে পাঠানো হল – এগুলো সুবিদিত ঐতিহাসিক তথ্য। এদের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ (সঠিক হিসেব ৪ লক্ষ ৮০,০০০ হাজার) শুধুমাত্র অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশ থেকেই গিয়েছিল। অর্থাৎ ৩/৫ ভাগ বা কিছু বেশি পাঞ্জাবির অংশগ্রহণ ঘটেছিল। এরা ইউরোপে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকজন ঐতিহাসিকের হিসেবে এ সংখ্যা ছিল ২৪০,০০০।[25] এদের মাইনেও ব্রিটিশ সৈন্যের তুলনায় যৎসামান্য ছিল – মাসে ১১ টাকা দিয়ে শুরু, সর্বোচ্চ মাইনে হত ২০ টাকা। পদমর্যাদার দিক থেকেও নিম্ন ছিল। সর্বোচ্চ পদমর্যাদা হত রিসালদার-মেজর (ক্যাপ্টেন র‍্যাংকের তুল্য জুনিয়র কমিশনড অফিসার)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরে এদের সবার চাকরি চলে যায়। স্বস্থানে ফিরে আসে।

(২) এদের কীভাবে নেওয়া হত? “the British authorities used harsh methods to recruit people to the army. At times, police parties raided villagers at night and carried away young men for the army. The villagers who refused to send their sons to to the army were even refused water to irrigate their lands. Thousands of Indians were thus forced to join the army against their wishes.”[26]

(৩) ভারতীয়দের ওপরে যুদ্ধকর চাপানো এবং সমস্ত খাদ্যদ্রব্য মিলিটারির জন্য সংগ্রহ করার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের অস্বাভাবিক রকমের বৃদ্ধি পায়। মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ জমা হতে থাকে। যুদ্ধকরের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি পাউন্ড – আজকের হিসেবে প্রায় ১৪,০০০ কোটি পাউন্ড। দরিদ্র ভারতবাসীকে এই ট্যাক্স দিতে হয়েছিল এবং সামাজিক অসন্তোষের আরেকটি মাত্রা যুক্ত হয়েছিল সে সময়ে।

(৫) গোটা যুদ্ধের সময় জুড়ে ভারতবর্ষ কলেরা, প্লেগ ম্যালেরিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির কবলে পড়ছিল। এর মধ্যে জুন ১৯১৮-তে বোম্বের একটি সৈন্যবাহী জাহাজ থেকে ছড়ানো ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি ১২ কোটি মানুষকে আক্রান্ত করেছিল, মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ।[27]

(৬) সামগ্রিক অসন্তোষের ফলশ্রুতিতে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের জন্ম হল – ১ম, ১৯১৩ সালে তৈরি হওয়া স্বল্পস্থায়ী গদর আন্দোলন; ২য়, ১৯১৫-১৬ সালের খিলাফত আন্দোলন যাকে গান্ধিও সমর্থন করেছিলেন; ৩য়, এপ্রিল ১৯১৬ থেকে বাল গঙ্গাধর তিলক এবং অ্যানি বেসান্টের নেতৃত্বে হোম রুল আন্দোলন।[28]

(খিলাফত আন্দোলনের একটি চিত্র)

(৭) এই পটভূমিতে ভারতীয়দের গগনচুম্বী অসন্তোষকে আরও কঠোর হাতে দমন করার জন্য জারি করা হল Rowlatt Act বা রাওলাট আইন তথা “কালা কানুন”। সরকারিভাবে এই আইনের পারিভাষিক নাম ছিল Anarchical and Revolutionary Crimes Act of 1919। এর ২টি অংশ ছিল – একটি গৌণ, এবং যেটা কখনো কার্যকরীই হয়নি; অপরটি মুখ্য। প্রথমে বিল হিসেবে ছিল, পরে আইন হয়। বর্তমান ভারতবর্ষে এখন যেমন সবক্ষেত্রেই হয়। এই দ্বিতীয় বিলটিকে ভারতীয় বিরোধীপক্ষ এক কথায় বলেছিল “না দলিল (কোন যুক্তি নয়), না উকিল, না অ্যাপিল” – “allowed courts to sit in camera, and to admit evidence which have been rule inadmissible … The publication of the two Bills aroused unprecedented public opposition from all section of Indian opinion, loyalist, moderate and extreme.”[29]

(গান্ধির রাওলাট বিল/আইন নিয়ে বক্তব্য)

বর্তমান ভারতের “দেশদ্রোহ বিরোধী” আইনগুলোর সাথে সাদৃশ্য পাচ্ছেন?

এর প্রতিবাদে শুরু হল গান্ধির সত্যাগ্রহ আন্দোলন – সমগ্র ভারতের আপামর জনতা আন্দোলিত হয়ে উঠলো। এর পরবর্তী ঘটনাক্রম আমি সংক্ষেপে আগেই বলেছি। এরই চূড়ান্ত পরিণতি জালিওয়ানালা বাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ড। আমি এখানে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের কথা ইচ্ছে করেই উল্লেখ করলাম না।

পলাশীর যুদ্ধ যদি ব্রিটিশ ভারতের ভিত্তি তৈরি করে থাকে, তাহলে জালিওয়ানালা বাগ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের “শেষের শুরু”র সূচনা করেছিল।

_______________________________________________________

[1] “জালিওয়ানালাবাগে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি নেই, বসানোর পরিকল্পনাও নেই, কেন্দ্রের জবাবে ক্ষুব্ধ তৃণমূল”, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ জুলাই, ২০২৫ – https://www.anandabazar.com/west-bengal/row-over-a-proposal-for-placing-statue-of-rabindranath-tagore-in-jallianwala-bagh-massacre-spot-of-amritsar-dgtl/cid/1620816#goog_rewarded

[2] এ অংশের আলোচনার জন্য আমি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম আলো সংবাদপত্রের কাছে ঋণী – https://www.prothomalo.com/onnoalo/treatise/%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%97-%E0%A6%93-%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%80-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6

[3] Rupert Furneaux, Massacre at Amritsar, 1963, pp. 112-113.

[4] Edward Thompson, A Letter from India, 1932, p. 99.

[5] প্রশান্ত কুমার পাল, রবিজীবনী, ৭ম খণ্ড।

[6] পাল, প্রাগুক্ত।

[7] “Twenty Years After a Brutal Massacre, It’s Payback Time”, NY Times, June 25, 2019 – https://www.nytimes.com/2019/06/25/books/review/patient-assassin-anita-anand.html#:~:text=On%20April%2013%2C%201919%2C%20a%20column%20of,a%20city%20in%20Punjab%2C%20where%20more%20than.

[8] Edward Thompson, A Letter from India, 1932, p. 98.

[9] কোলেট মন্তব্য করছেন – “It had no British soldiers, and most of its Indian troops were men of nationalities fopreign to India or recruited from its gringes … troops who were not liable to recoil action against the locals … Also significantly, he decided to lead the small party himself.” – Collett, ibid, p. 256.

[10] Kishwar Desai, Jalliwanala Bagh, 1919: The Real Story, 2018, p. xvi.

[11] Bhisham Sahani, Jalliwanala Bagh, 2009, p. 28.

[12] Nigel Collett, The Butcher of Amritsar: General Reginald Dyer, 2005, pp. 251-252.

[13] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৫৩।

[14] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৫৪-২৫৫।

[15][15] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৫৭।

[16] লন্ডনে প্রশিক্ষিত ডাক্তার যিনি ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস-এ (IMS) কর্মরত ছিলেন। ১৯১৯-এ রাওলাট আইনের প্রতিবাদে চাকরি ছেড়ে দেন। পাঞ্জাব কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব সামলেছেন।

[17] ইনিও কেমব্রিজ এবং জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে সফল প্র্যাক্টিসরত আইনজীবী ছিলেন। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে নিজের পেশা পরিত্যাগ করে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে লেনিন শান্তি পুরষ্কার পান।

[18] সাহানি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৬।

[19] সাহানি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৬-৪০।

[20] সাহানি, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪১।

[21] Collett, ibid, p. 263.

[22] Collett, ibid, p. 373.

[23] Kishwar Desai, Jalliwanala Bagh, 1919: The Real Story, 2018, p. 110.

[24] Ibid, p. xiii.

[25] Frederick William Perry, Order of Battle of Divisions Part 5B. Indian Army Divisions, 1993, p. 85.

[26] The Story of Jalliwanala Bagh, Publications Divisions, Govt. of India, 1981, p. 3.

[27] The Story of Jalliwanala Bagh, পৃঃ ৩।

[28] Sahani, Jalliwanala Bagh, pp. 9-14.

[29] Collett, ibid, pp. 220-221.

PrevPreviousমনের রোগ সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা
Nextঝর্ণা কলমNext
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
ইন্দ্রনীল সেন
ইন্দ্রনীল সেন
5 months ago

Auswitch of Indian Freedom Struggle

0
Reply
অরিন!
অরিন!
5 months ago

সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ লেখা, সবাই পড়ুন ও পড়ান!
একটা কথা না বললেই নয়, অতীব দুঃখের বিষয়, আজকের আমলের মোদী সরকার জালিওয়ানওয়ালা বাগকে সুসজ্জিত করতে গিয়ে এই যন্ত্রণার ইতিহাসকে লঘু করে ফেলেছেন। জাতি হিসেবে এমন একটা ঘটনার বিবরণ এত বছর পরে পড়তে গিয়েও চোখে জল এসে গেল। রবীন্দ্রনাথের সাহসী প্রতিবাদের পাশাপাশি গান্ধী এবং চিত্তরঞ্জন দাশের কথা পড়ে খারাপ লাগল।
আজকের ভারতে যে দমন পীড়নের সংস্কৃতি চলছে, তার প্রেক্ষিতে এই লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

0
Reply
Utpal Das
Utpal Das
5 months ago

আজকের ভারতবর্ষে এই লেখার গুরুত্ব অনেক । অনেকটাই জানতাম । তারপরেও অনেক অজানা তথ্য পেলাম । ডাঃ সত্যপালের পুরো নাম কি ডাঃ সত্যপাল ডাং? রেফারেন্স গুলি অন্তত একবার পড়ে দেখতে চাই ।

0
Reply
Soumya Chakraborty
Soumya Chakraborty
5 months ago

Good one sir.

0
Reply
বর্ণালী দত্ত
বর্ণালী দত্ত
5 months ago

নতুন করে যেন ইতিহাসটাকে আরও জানতে ইচ্ছে হচ্ছে তোমার লেখা পড়ে..

0
Reply

সম্পর্কিত পোস্ট

পক্ষ নিন নির্যাতিতার। রুখে দাঁড়ান নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে।

May 22, 2026 1 Comment

২১ মে, ২০২৬ অভিনেত্রী অঙ্কিতা চক্রবর্তীর একটি প্রেস কনফারেন্স থেকে আমরা জানতে পারি দেবালয় ভট্টাচার্য নামের এক পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগের কথা। গবেষণায় দেখা

আরশোলার চিঠি

May 22, 2026 No Comments

দুশুঁড় ছ’পা’য় গড় দুপায়ে, ধর্মাবতার, ভাবনা যেটা ধরতে গেলে সকল নেতার তাকেই কেমন স্পষ্ট করে বিনা সময় নষ্ট করে বলেই দিলেন, রাষ্ট্র ভাবেন কাদের ভিলেন

জাতীয় ডেঙ্গু দিবস

May 22, 2026 No Comments

১৬ মে, ২০২৬ আজ জাতীয় ডেঙ্গু দিবস।  কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দেওয়া এ বছরের থিম হল Community Participation for Dengue Control: Check, Clean and Cover”. তাই

আপনি কোন দলে? হিন্দু ধর্ম বনাম হিন্দুত্ব

May 21, 2026 No Comments

অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম, হিন্দু ধর্ম এবং হিন্দুত্ব নিয়ে একটা লেখা লিখবো । কিন্তু ধর্ম নিয়ে আমার পড়াশোনার সীমাবদ্ধতার জন্য লিখে উঠতে পারছিলাম না । আজ

নির্মল মাজি-কে মেডিকেল কাউন্সিল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে দু’চার কথা

May 21, 2026 No Comments

প্রথমত, নতুন সরকার এলে, সাধারণত, পূর্বতন সরকারের মনোনীত সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া হয় (বা তাঁরা নিজেরাই সরে যান) – এটা শুধুমাত্র মেডিকেল কাউন্সিল নয়, সর্বত্রই করা

সাম্প্রতিক পোস্ট

পক্ষ নিন নির্যাতিতার। রুখে দাঁড়ান নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে।

Abhaya Mancha May 22, 2026

আরশোলার চিঠি

Arya Tirtha May 22, 2026

জাতীয় ডেঙ্গু দিবস

Dr. Samudra Sengupta May 22, 2026

আপনি কোন দলে? হিন্দু ধর্ম বনাম হিন্দুত্ব

Kanchan Sarker May 21, 2026

নির্মল মাজি-কে মেডিকেল কাউন্সিল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে দু’চার কথা

Dr. Bishan Basu May 21, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

624425
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]