I always like walking in the rain, so no one can see me crying. চার্লি চ্যাপলিনের কথাটুকু আমায় খুব ভাবায়। বা রবীন্দ্রনাথ। এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি, / কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাঢাকি।
খুব ছোটবেলায় আমি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তাম। অবশ্য সেই স্কুলে মনে হয় বালকদের সংখ্যাই বেশি ছিল। খেলার ক্লাসের খেলাগুলো ছিল কিছুটা মেয়েলি ধরনের। রুমাল চোর, কানামাছি বা কুমিরডাঙা। সোমালি, ঋত্বিক, তিতির, সোমা- টিফিনে বা খেলার পিরিয়ডে একসাথে হুল্লোড় করতাম। আমি বেশ বোকা ছিলাম। (স্ত্রীর বক্তব্য এখনও তাই আছি। সবাই আমায় ঠকিয়ে নেয়।) আমি অধিকাংশ সময়ই রুমাল চোরে চোর হতাম বা কুমিরডাঙায় কুমির। সারাটা টিফিন পিরিয়ড কাল্পনিক জলেতে হাবুডুবু খেতাম। সবাই “কুমির, তোর জলকে নেমেছি” বলে কাছাকাছি এসে পালিয়ে যেতো। ক্লাস ফোরে সেই একগলা জলে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সোমালি, ঋত্বিক, তিতির, সোমারা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমি আজও জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের খুঁজে ফিরি।
বালিকাদের স্কুল থেকে গেলাম ‘শুধুমাত্র বালক’দের স্কুলে। রামকৃষ্ণ আশ্রমের মনের ব্যায়াম ক্লাস বা পেছনের বাগানে নিজের বসানো গাছটার পরিচর্যা করতে করতে জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি সময়টায় বন্ধু হলো অমিত, অভিজিৎ, প্রসেনজিৎ, শঙ্কর, কৌশিক, কাজি, বরুণের মতো ছেলেরা। স্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যে অনেকগুলো স্কুল। আমরা পড়তাম সিনিয়র বেসিকে। রীতিমত ভোট হয়ে ক্লাস মনিটর নির্বাচিত হতো। একবার মনিটর আর একবার ভাইস মনিটর হয়েছিলাম। চারছয়ের ইন্টারস্কুল টুর্নামেন্টে স্কুলের হয়ে খেলতে গিয়েছিলাম মনে আছে। বড়ো মহারাজের আশীর্বাদ নিয়ে স্কুল বাসে করে সবাই হইহই করতে করতে গেলাম। গলায় “উই শ্যাল ওভারকাম” গান।যেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল চলেছে। মাঠে গিয়ে প্রতিপক্ষ স্কুলের ছেলেদের দেখে গলা শুকিয়ে গেল। সব গাঁট্টাগোট্টা তাগড়াই ছেলে। কিরকম একটা নিঃশ্বাস চেপে কুঁজো হয়ে দাঁড়াচ্ছে আর চারছয়ের মাপকাঠিটার তলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। তিরিশ মিনিটের খেলায় ছখানা গোল খেয়েছিলাম। তাও মনে হয় মাত্র ছখানা গোল প্রতিপক্ষ দলের মহানুভবতার পরিচায়ক। জীবনস্যার গেমটিচার। বাসে উঠে স্যারের বক্তৃতা – সব খেলায় কেউ জিতবে এবং কেউ হারবে। জীবনে একবার হেরে যাওয়াটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। আরে, আমরা খেলেছি বলেই তো ওরা জিতেছে। সাথে রবার্ট ব্রুসের গল্প। বাস যখন স্কুল চত্বরে ফিরছে তখন বাসের ভেতর গমগম করছে একপাল শিশু কণ্ঠের একই গান- উই শ্যাল ওভারকাম। কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না ছেলেগুলো কিছুক্ষণ আগে ছ গোলে হেরেছে।
এক লহমায় যেন সেই বাসটা আমার শৈশব আর কৈশোর নিয়ে কোনো এক অজানা পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল।
হালকা গোঁফ উঠছে তখন। শ্রীরামপুর কলেজের নদীর পাড় ঘেঁষে প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায়। হায়ার সেকেন্ডারি আর জয়েন্ট শেষ হয়েছে। সেই টলমলে কর্মহীনতার সময় কয়েকজন বন্ধু সাইকেলে করে সেই মুহূর্তটা ধরতে যেতাম। প্রেম হয়নি, কিন্তু সূর্য ডোবার সময় কোনোএক নীলাঞ্জনা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গোধূলি রঙ সালোয়ার কামিজে লাগাতো। আমরা তিন বন্ধু কলেজে ঢুকে নোটিশ বোর্ডে জয়েন্টের রেজাল্ট বেরিয়েছে কিনা দেখার নাটক করতাম, চোখের কোনে অস্পষ্ট ভাবে থাকতো নীলাঞ্জনার চলে যাওয়া। সেই বোর্ডেই একদিন আমার নাম ঝুলতে দেখলাম। নদীর ধার থেকে গিয়ে পড়লাম খালপাড়ের সমুদ্রে।
ঝকঝকে একপাল তরুণ তরুণী। প্রবালের সাথে বন্ধুত্ব হল, আমরা দুজনেই মফস্বলের ছেলে। কৌ রাজনীতির সহজপাঠ হাতে ধরিয়ে দিল। একটু ডাক্তারি শিখেই পান্ডবেশ্বরে মেডিক্যাল ক্যাম্পে গেলাম। নিউমোকোনিওসিস। দারিদ্র। অসহায়তা। সমান্তরালে চলছে খুব সুন্দর মনের কিছু ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পরিচয়, বন্ধুত্ব। চির, শুভঙ্কর, চার কৌশিক, নির্মাল্য, সব্যসাচী, সঞ্জয়, সমুদ্র, জয়ন্ত, ইন্দ্র, অমৃতা, কাবেরী। অনেক নাম। মেন হোস্টেল, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি। ইন্টার্নশিপ, হাউসসার্জন। এখনও রিইউনিয়নে সেই ঝকঝকে ছেলেমেয়েগুলোকে খুঁজে ফিরি। হোয়াটসঅ্যাপে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করি। বুঝতে পারি বয়স বাড়ছে। এই প্রৌঢ়রা আমার কলেজের সেই যুবক নয়। হঠাৎ করে কোনো বন্ধু আঙুল ছাড়িয়ে অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্মৃতি ফিকে হয়। হয় বুঝি?
আমি হাঁটতে থাকি। এক শহর থেকে আরেক জায়গায়। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। বাড়ির ঠিকানা বদল হয়। গভীর রাতে স্মৃতির গহ্বরে হাত চালাই নতুন ঠিকানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এক জীবন ভর্তি মানুষের মুখ। ঝপ করে মনে পড়ে যায় ধানুদার কথা। ধানুদা ছিল দাদার বন্ধু। খুব ভালোবাসতো আমায়। আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে দিয়ে আমার হাতে লাটাই ধরিয়ে দিত। আমার জন্য কোথা থেকে এক মুঠো ভর্তি টকমিষ্টি স্বাদের ফলসা নিয়ে আসতো। বিভিন্ন রঙের সিগারেটের প্যাকেট রাস্তা থেকে কুড়িয়ে গিফট করতো আমায়। সেই বয়সে সেগুলো ছিল আমার মহা মূল্যবান সম্পত্তি। আমার থেকে বছর পাঁচ-ছয়ের বড়ো ছিল। ধানুদার তখন ক্লাস টেন। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলায় শুনলাম ধানুদা রেললাইনে মাথা দিয়ে সুইসাইড করেছে। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। সিগারেটের প্যাকেটগুলো একদিন চুপিচুপি রেললাইনের ধারে ফেলে দিয়ে এসেছিলাম। আমাদের বাড়ি ছিল রেললাইনের খুব কাছে। আমার জীবনে প্রথম প্রিয়জনের মৃত্যু।
মা আর বাবার মৃত্যুর মধ্যে ব্যবধান ছিল খুব কম সময়ের। তখন মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখতে শিখে গিয়েছি। কিন্তু একটা অপরিসীম শূন্যতা গ্রাস করে। এক ধাক্কায় বড়ো হই। কিন্তু মৃত্যুকে ছোঁয়ার মতো বড়ো হতে পারলাম কোথায়? “ নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ /ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি/ আমায় / তিন প্রহরের বিল দেখাবে?”
অনেক মানুষের মাঝখানে ক্রমশ একলা হই। সেই একলা অনির্বাণ ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা ভেবে যন্ত্রণায় মুচড়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে থাকে। কান্নার দাগ মুছে যায় বৃষ্টিতে।











অসাধারণ স্যার🙏
সুন্দর!!
খুউব ভালো লাগলো। মন্তব্য করার মতো অনেক কিছু কিলবিল করছে, কিন্তু appropriate কিছু বেরোচ্ছে না।