পুজোর ঠিক আগে কলকাতায় প্রবল মেঘভাঙা বৃষ্টিতে চারদিন আমাদের কমপ্লেক্স জলবন্দী ছিল, তাই নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি। জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, চারপাশ নোংরা নরক ইত্যাদি।
সে সময় কলকাতা জুড়ে হই চই, গেল গেল রব। মেয়র হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছেন, মেয়র পারিষদ ‘যখন জলে নামলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হবার আশংকা তখন কেন জলে নেমে লোকে আত্মহত্যা করছেন’ এরকম অমোঘ বাণী বিতরণ করছেন, মহারাণী ভূটান, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ডিভিসির ওপর ম্যান মেড বন্যার দায় চাপাচ্ছেন আর সিইএসসি ন-জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে রাজ্যের সকল দায় ঝেড়ে ফেলছেন, পাত্র-মিত্র-আমাত্য-কবি-শিল্পী তারকা সবাই জলমগ্নতায় বাইট-ব্যস্ত! আর আজ যখন উত্তরবঙ্গ ভেসে যাচ্ছে, অগুন্তি বন্য প্রাণীসহ ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আরো কত হবে জানি না, সে সময় মুখ্যমন্ত্রী তার সকল পারিষদ, কবি-গায়ক-চিত্রকর, মন্ত্রী-সান্ত্রী আমলা-গামলা আর তারকাবেষ্টিত হয়ে কোটি কোটি টাকার কার্নিভালে নেচেছেন! সকল চ্যানেল ইচ্ছে কিংবা অনিচ্ছায় সকল খবর ছেড়ে মহা সমারোহে সেই নাচ-গান শোভাযাত্রার মাঝে মহারাণী যে দেবীর চাইতেও বড় দেবী সেই মাহাত্ম্য প্রচারের অংশীদার হয়ে নিরলস সম্প্রচার চালিয়েছে। এ যদি লজ্জা না হয় তা হলে লজ্জা কাকে বলে?
শাসকের যুক্তি অনুযায়ী তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় যে শেষ মুহূর্তে শোভাযাত্রা বন্ধ করা যেত না তাহলে বিকল্প ধরা যাক এমন যদি হত, মহারাণী উত্তরবঙ্গে ছুটে গেলেন আর শোভাযাত্রা শোভাযাত্রার মত হল। তাহলে কার ক্ষতি হত? উত্তর হল ক্ষতি হত একমাত্র মহারাণীর কারণ এই শোভাযাত্রার একমাত্র উদ্দেশ্য তাঁর প্রচার, তাঁকে দেবীর উচ্চতায় তুলে ধরা। দেবীমুখের পাশাপাশি বারবার, হাজার বার তাঁর বদনটি দেখানো হবে, তাঁর বালখিল্য ভাষায় লেখা গানের সঙ্গে খোনা-বউদির নৃত্য পরিবেশিত হবে, মহারাণীরো অসামান্য হবে নৃত্য থমকিয়া থমকিয়া, তাঁকে ঘিরে হেঁ হেঁ করবেন তোষোণজিৎ, মাইমা, ঢংকুশ, নরমব্রত, প্লাবন্তী, শিশু সরল মহানায়ক-নায়িকারা আর চ্যানেলে চ্যানেলে বাংলার মানুষ এই সার্কাস দেখবেন। এইসব শুধু এইসবের জন্যই এই প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর মৃত্যুমিছিলের মাঝেও নির্মম নিষ্ঠুরতায় কোটি ধন গেল মহারাণীটির ‘একপ্রহরের প্রমোদে’!
মহারাণীর উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আত্মমহিমা প্রচার তুঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, দেবীকে সঙ্গে নিয়ে। শত মরণেও এ সুযোগ তিনি ছাড়বেন না। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই শোভাযাত্রায় যে তারকাকূল, কবি, শিল্পী ইত্যাদি তথাকথিত বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের উদ্দেশে। যদি এই বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষগুলোর প্রতি, ২৮ টি চলে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের প্রতি সামান্য সহমর্মিতা দেখিয়ে শোভাযাত্রায় যাওয়া থেকে বিরত হতেন তাহলে জীবনের প্রাপ্তিতে কতটা কম পড়ত? দর্শক হিসেবে কারা উপস্থিত ছিলেন আমি জানি না। কিন্তু আপনাদেরও মনে হল না কিছু? আমি জানিনা মানুষ এত অসংবেদনশীল হয়ে যায় কী করে? শুধু নিজেরটুকু শুধু নিজেরটুকু? কলকাতার বৃষ্টিটা যদি উত্তরবঙ্গের সঙ্গে একই সময় হত। যদি আমাদের রাস্তাঘাট, ঘরদুয়ার জলমগ্ন থাকত তাহলে আপনারা যেতে পারতেন তো মহারাণীর প্রমোদোৎসবে? পারতেন না কারণ তখন যে নিজের ঘর ভাসে! নিজেরটুকুতে হাত না পড়লে আমরা কতটা নির্বিকার, তোষামুদে, আদ্যন্ত সুযোগসন্ধানী আর শিরদাঁড়াহীন!
তারকাদের বলতে ইচ্ছে করে পুতুলনাচের ইতিকথার সেই অমোঘ লাইন, ‘শরীর শুধু শরীর! তোমার মন নাই তারকাকূল?’










