সে ছিল এক বসন্তের বিবাগী দুপুর। আউটডোর শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁয়ে ফেলেছে সময়। এমন সময় খুব খুউব রোগা, অদ্ভুত একটা ঢলঢলে ফতুয়া আর কোমরের উপর দড়ি বাঁধা খুউব ময়লা, খুউব রঙ চটা, খুউব বিচ্ছিরি একটা পাজামা পরে যখন সে এল তখন আমার রুগী দেখার ইচ্ছেরা প্রায় তলানিতে। মন খিট খিটে। বিরক্তি ভরপুর। তার মধ্যে সে এসেই আউট ডোরের বেঞ্চে বসে খক খক কাশতে কাশতে একদলা ঘন কফ থুঃ করে ফেলে দিল ভরা ঘরে, আমারই টেবিল থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে।
এসময় চেঁচিয়ে ওঠায় দোষ কিছু নেই। কিন্তু অদ্ভুত ক্যাবলামো ভরা তাঁর ভঙ্গিমা। চুপসে যাওয়া গাল আর পানখাওয়া খয়েরী দাঁত। কান এঁটো করা হাসি হেসে বল্ল:’মুইছা দিমু স্যার? দিই?
বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে তখন আমার চিৎকার করার ইচ্ছেটাও শেষ। ঘচ ঘচ বিপি মাপতে মাপতে গজ গজ করি। যেখানে সেখানে থুতু ফেলেতে নেই এই কমন সেন্সটাও নেই, না? তো
কাশি কদ্দিন?
ভ্যালা দেবনাথের সব বকা ঝকার একটাই রেসপন্স। নিরুত্তাপ কান এঁটো করা হাসি। অপরাধ কবুল করা, সব অপমান মেনে নেওয়া হাসি।
বিড়ি টিরি খাই তো। কাশি ধরেন লাইগাই থাকে। তয়, জ্বর ডা হইলো তাও… দশ বারো দিন।
ততক্ষণে আমি স্টেথো বাগিয়ে শুনে ফেলেছি বুকের হাওয়া চলাচলের হাসফাঁস। মিউকাসের ফর ফর। আর মনের কোণে ঘন মেঘের মত জড়ো হয়েছে তীব্র এটা সন্দেহ। টিবি নয়তো?
সে সন্দেহ সঠিক হয়েছে দিন কয়েক পরেই। স্পুটাম এ এফ বি পজেটিভ। টু প্লাস। সাথে হাই ডায়বেটিস। এইচ বি ওয়ান সি 12
এক্ষেত্রে ইনসুলিন শুরু করাই নিয়ম। টিবির ওষুধের সাথে সাথে সেটাও শুরু হল নিয়মমাফিক। ভ্যালা দেবনাথও সাথ দিয়েছিল খুব। প্রায় তিরিশ বছরের বিড়ির নেশা এক লহমায় ছেড়ে দিল সে। আউটডোরে বসে বসে সকলকে শুনিয়ে নেতার ঢঙে লেকচার দিত :
মাইনষে চাইলে কি না পারে কন। বিড়ি আমি ছাইড়া দিছি স্যার।
আমি হাসতাম। খুশি লুকিয়ে পেছনে লাগতাম। এখন আর এখানে সেখানে কফ ফেলো না তো ভ্যালাদা?
কান এঁটো করা হাসি হেসে মাথা নিচু করতো সে। কি যে কন স্যার! মাইনষে আপন। রোগ ডা না..
প্রথম মাসের পরই এক ধাপে তার ওজন বেড়ে গেল প্রায় পাঁচ কেজি ।
একদিন তিন খানা ডাব নিয়ে হাজির আউট ডোরে।
আবার কাজ শুরু করছি স্যার। ডাব পারতে উইঠ্যা যাই। ইনকাম ভালই। ভালো আছি স্যার। খাইয়া দেইখেন স্যার। জুরান বিলের পাশের ডাব স্যার। খুউব মিষ্টি জল।
মনে মনে খুব খুশি হই। প্রকাশ করি না। কাজের কথায় আসি চট পট।টিবির ওষুধ বন্ধ করো নি তো?
কী যে কন স্যর। ম্যাডাম আমারে গুড কইসে কাইল। একটাও দাওয়াই বাদ দিই নাই স্যার।
ওকে। ওকে। তা তোমার ডাবের দাম কত। আমি প্রসঙ্গ পাল্টাই। ভ্যালাদাকে বকতে দিলে রক্ষে নেই।
এক হাত জিভ বের করে ভ্যালা দেবনাথ। কি যে কন স্যার।আমার পাপ হইবো। আপনি আমার ভগবান।
আমার মনটা খুশি খুশি লাগে। আরোগ্য এমন এক জিনিস যা আনন্দ ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ভিড় আউটডোরে বিদেয় দিতেই হয়।
ওকে ওকে। মাঝে মাঝে এসো। ভালো থেকো।
তা, সত্যি সত্যি সে এলো। কিছুদিন বাদেই। এক আউটডোর লোকের সামনে কাশতে কাশতে। কিন্তু একবারও থুতু ফেলেনি সে।
কি বেপার ভ্যালাদা? কাশি বেড়েছে নাকি!
কি করুম স্যার। ওষুধ নাই। ম্যাডাম কইলো। ফুরায় গেছে। সাপ্লাই নাই। কাশি বাইরা গেছে স্যার। আপনে আমারে বাইরের ওষুধ লেইখা দেন স্যার। কিনা নিমু।
টিবির ওষুধ অপ্রতুল জানতাম। সে যে ভাঁড়ে মা ভবানী জানতাম না সেটা। এও জানতাম না দোকানে দোকানেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা সেটা। খবর দিল ভ্যালা দেবনাথ। প্রথম।
কোথাও ওষুধ নাই স্যার। কি করুম স্যার। কাশি তো আবার বারতাছে স্যার!
এসব ক্ষেত্রে যা করতে হয় আরকি। আচ্ছা। তুমি কাল এসো।দেখছি।
অথচ জানি দেখার কিছুই নেই। একজন সামান্য ডাক্তারের চুপ করে দেখা ছাড়া, এখানে ওখানে ফোন করে, একপাতা দু পাতা ওষুধ জোগাড় করা, ছাড়া কী বা করার আছে!
এই মুহূর্তে প্রায় শ খানেক আমারই রুগী পাচ্ছে না টিবির ওষুধ।
মাথা নীচু করে দেখছি বলা ছাড়া কি বা করতে পারি আমি!
ভ্যালা দেবনাথ সেদিন আবারও এল। এবার শরীর থেকে উধাও সবটুকু জেল্লা। কোমরটা চুপসে গেছে অনেকটাই। খুকখুক কাশি লেগেই আছে, লেগেই আছে। আজও হাতে দুটো ডাব।
রাইখা দেন স্যার। কয়দিন আর কাজ করতে পারুম কেডা জানে।
খাইয়া দেইখেন স্যার। জুরাণ বিলের পাশের গাছ স্যার। খুউব সোয়াদ জলে স্যার। খুউব মিষ্টি জল স্যার।
তারপর খুউব সন্তর্পণে। খুউব অপরাধের ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে: কিছু খবর আছে স্যার? ওষুধ আইসে!
এসময় মাথা নিচু করে দেখছি, দেখছি বলতে হয়। এসময় সোজা সুজি তাকাতে নেই। এসময় ব্যস্ততা দেখাতে হয় খুব।
কাশতে কাশতে চলে যায় ভ্যালা দেবনাথ। বারান্দা পার করে, সাবুদানা গাছ.., বিবেকানন্দ স্ট্যাচু পার করে,ওয়াক করে থুতু ফেলে। থপ করে শব্দ হয় কফের..
আমার খুব রাগ হয়। রাগ হতে থাকে।
ভয়ঙ্কর একটা রাগ









