প্রথমেই কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
‘সিলেক্টিভ সেক্যুলার’ বলে কোনো টার্ম থাকতে পারে না। সেক্যুলার হলে সিলেক্টিভ হওয়া যায় না। যে সিলেক্টিভ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পক্ষেই হোক বা ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর পক্ষে, সে নন-সেক্যুলার।
যে ‘সিউডো-সেক্যুলার’, শব্দটা থেকেই স্পষ্ট, সে মিথ্যে বা নকল সেক্যুলার। তাদের কাজের দায় সেক্যুলারদের কাঁধে চাপানো, ঘোরতর অন্যায়। ছলচাতুরি-হোয়াট্যাবাউটারির আশ্রয় নিয়ে, জল মেপে-মেপে অবস্থান নিলে, আর যাই হোক, সেটাকে সেক্যুলারিজম বলা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ‘সিউডো-সেক্যুলার’ নাম দিয়ে, সেক্যুলারদের সঙ্গে এক গোষ্ঠীভুক্ত করে দেখাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
‘সেকু’ মানেই ‘মাকু’ নয়। সেক্যুলার হলেই তাকে মার্কসবাদে বিশ্বাস করতে হবে এরকম মাথার দিব্যি কেউ দেয় নি। তাই সেক্যুলারদের গালাগাল দিতে গিয়ে সারাক্ষণ “সেকু-মাকু” লেখাটা অপ্রয়োজনীয়।
এমনিতে মার্কসবাদী হলে সেক্যুলারও হওয়ার কথা। তবে ভুরি ভুরি ঘোষিত মার্কসিস্ট দেখা আছে যারা ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত নন-সেক্যুলার। তাই সেক্যুলারদের গুষ্টির তুষ্টি করার জন্যে ‘মাকু’-দের ধরে টানাটানি করার দরকার নেই।
সেক্যুলার, বা ধর্মনিরপেক্ষ হতে গেলে তার চিন্তা-আচরণ-বক্তব্য-কাজ গোষ্ঠী-ধর্ম-নিরপেক্ষ হতে হবে। মানবতার ভাবনার বীজ মনের মধ্যে প্রোথিত থাকলে, সে কাজ তেমন কঠিন নয়। ভারতীয় সংবিধান, অন্তত এই মুহূর্ত পর্যন্ত, ধর্মনিরপেক্ষতা পালনের উৎসাহই শুধু দেয় না, সেক্যুলারিজমকে এখনও ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের একটা আবশ্যিক উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাই সেক্যুলার এবং সেক্যুলারিজমকে গালাগাল দিলে তা সংবিধান এবং দেশকে অসম্মান করা হয়। সেটা সামাজিক মাধ্যমে রাম-শ্যাম-রমা-শ্যামা করলেও হয়, আবার টিভির পর্দায় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে, চিল্লিয়ে মাত করা কোনো তথাকথিত সংবাদ পরিবেশক করলেও হয়।
যে পারছে, যখন পারছে, সেক্যুলারদের গালাগাল দিচ্ছে। আসল দোষীদের গালাগাল দেওয়ার মুরোদ নেই, সরকারকে প্রশ্ন করার সাহস বা ইচ্ছে নেই, শুধু বলির পাঁঠা খুঁজে চালাও পানশি। পাকিস্তান সন্ত্রাস করছে, দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে এদেশের সেক্যুলারদের, বাংলাদেশে-নেপালে ভারতবিরোধী হাওয়া উঠছে, দায়ী নাকি এদেশের সেক্যুলারকুল! কী সাঙ্ঘাতিক আন্তর্জাতিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশীয় সেক্যুলার সম্প্রদায় রে বাবা! এদিকে সংখ্যার বিচারে কি দেশে, কি পৃথিবীতে তারা অতি নগণ্য। এমনকি এতো বিশাল জনসংখ্যার সংবিধান-স্বীকৃত সেক্যুলার দেশেও প্রকৃত অর্থে সেক্যুলার মানসিকতার লোক খুঁজতেও মাইক্রোস্কোপ লাগে। আসলে না আছে সেক্যুলারদের সংগঠন, না আছে জোর, না আছে ক্ষমতা। তারাই আসল সংখ্যালঘু, তাই তারাই স্কেপগোট, তারাই সব দোষের নন্দ ঘোষ।
আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা মানব ধর্মেরই একটা গুণ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে অনেক ভালো ভালো কথা লেখা থাকলেও (অনেক মানবতাবিরোধী কথাও যে লেখা নেই তা বলছি না), তার ফলিত প্রয়োগ ডেকে এনেছে মানুষে মানুষে বিভেদ, বিছিন্নতা। সৃষ্টি করেছে একের পর এক যুদ্ধ, ধর্মের ভিত্তিতে ভেঙেছে দেশ-জনপদ-জাতি। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী। ধর্মকেন্দ্রিক বিবাদের বাড়বাড়ন্ত আজ পৃথিবী জুড়ে, প্রগতির চাকাকে স্তব্ধ করছে বারবার। সেই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যেই আজ আরো বেশি করে দরকার ধর্মনিরপেক্ষতার বোধ, মানবতার শুভবুদ্ধি।
সভ্যতার উন্নতি বলতে সাধারণভাবে আমরা যা বুঝি, যুগে যুগে তা কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামির হাত ধরে আসেনি, এসেছে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়েই। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষের উন্নতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ধর্মীয় অনিরপেক্ষতার বাতাবরণ, সবসময়ই সভ্যতাকে পেছন দিকে নিয়ে গেছে। চারশো-পাঁচশো বছর আগের খ্রী ষ্ট ধর্মচালিত ইউরোপই হোক বা এই সময়ের ইস লা মধর্মচালিত আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশ, সব ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে। সে তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষায় জারিত ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে সে সমস্যা অনেকটাই কম। ‘ভারত-ধর্ম’ও সেরকমই একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, যার প্রভাবে বৌদ্ধ, জৈন, বৈষ্ণব, শিখ ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উদ্ভব। যে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশে উদারপন্থী নরম হিন্দুত্বের ধারার পাশাপাশি উদারপন্থী সুফি ধারার ইসলামের বিকাশ। দুঃখের বিষয়, সেই ভারতবর্ষেই শিখ উগ্রপন্থা, ইসলামি উগ্রপন্থা, এবং হিন্দু উগ্রপন্থার আবির্ভাব। কে আগে কে পরে, কোনটা অ্যাকশান, কোনটা রিঅ্যাকশান, সেটা বোঝার মতো কোনো সহজ একমাত্রিক সূচক নেই। কিন্তু টাইমলাইনটা অস্পষ্ট হলেও, বাস্তবটা স্পষ্ট, ভবিষ্যতের রেখাটা ভয়ঙ্কর।
অবশ্য উইচ হান্টিং-এর আবহে এসব ইতিহাস-ভূগোল ফেঁদে লাভ হওয়ার কথা নয়, তা জানি। কিন্তু বাস্তব হলো, “লড়াইটা জাতের নয়, শুধুমাত্র ভাতের”, এই শ্লোগানটা যেমন বাস্তব-বিচ্ছিন্ন, “লড়াইটা ভাতের নয়, শুধুমাত্র জাতের”, এই ধারণটাও পুরোপুরি অবাস্তব। অথচ এই ধারণাটাই মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে। এই গাঁথার কাজটা সুনিপুণভাবে করে তুলছে দুই ধর্মের ব্যবসায়ীরাই। ভারতীয় মুসলিম সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা সংবিধান প্রদত্ত ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রয়োজন মতো ছাতা হিসেবে ব্যবহার করছেন, কিন্তু সেই সেক্যুলার স্ট্রাকচারের হাত ধরে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা উঠলেই ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় অনুশাসনের অজুহাত দিচ্ছেন। আবার ভারতীয় হিন্দু সমাজের অগ্রগণ্য প্রতিনিধিরা নিরপেক্ষতার যুক্তিতে সবার জন্যে এক আইনের দাবি তুললেও, যে কোনো অজুহাতে মুসলিমদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। যে যার মতো ব্যবহার করছে এই সংবিধান স্বীকৃত উপাদানকে, কিন্তু সব মিলিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটাই অস্বীকৃত হচ্ছে।
উগ্র ধর্মাবলম্বীদের কাণ্ডকারখানা দেখলে চমকে উঠতে হয়, ক্রুদ্ধ হতে হয়, আর বিষণ্ণ হতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রামেগঞ্জে হওয়া বিভিন্ন ইস লামি সভার যেসব বক্তব্য শুনি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো এতো বেশি মহিলাদের পক্ষে অবমাননাকর, অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি বিদ্বেষমূলক, জ্ঞানবিজ্ঞান-সভ্যতা-প্রগতির গতিরোধক, দেখেশুনে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ইদানিং আবার “জাগো হিন্দু, জাগো”-র আবহে জেগে ওঠা গর্বিত হিন্দুর কথোপকথনে দেখতে পাই “হিন্দু ধর্মের দুই শত্রু” বিদ্যাসাগর আর রামমোহনের মুণ্ডপাত, নতুন করে জাতপাতের সমর্থন ও নারী-স্বাধীনতা বিলোপের জিগির, আর ভিন্নধর্মীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। তাদের উদ্দেশ্য মনে হয় হিন্দু তালিবানিজম কায়েম করা।
এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের রকমসকম, কার্যকলাপ থেকে স্পষ্ট, শুধুমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এদের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ নয়। আদতে এদের টার্গেট দেশে ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েম করা। অথচ এই মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদ, এই জাতপাত-অস্পৃশ্যতাই হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড়ো বিপদ, সবচেয়ে মারাত্মক দুর্বলতা। এই জন্যেই যুগে যুগে হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়েছে। এই নিয়মের বেড়াজালেই জোর করে কোনো হিন্দুর গায়ে বদনার জল ছিটিয়ে দিলে বা তাকে গো মাংসের গন্ধ শুঁকিয়ে দিলে, তাকে হিন্দুরা ধর্মচ্যুত করতো। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে এইসব অমানবিক হিন্দু প্রথার জন্যেই ভারতবর্ষের এতো মানুষ আজ ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
এই ব্রাহ্ম ণ্যবাদে দীক্ষিত উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা, হিন্দুত্বের তথাকথিত ইসলাম তালিবানিকরণে বিশ্বাসী উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ইদানীং উঠতে বসতে সেক্যুলারদের গালাগালি দিচ্ছে। তারা দেশের সরকারকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, কাশ্মীরে গিয়ে ত্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই করতে ভয় পায়, মুর্শিদাবাদে গিয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে ভয় পায়, শত্রুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। এক কথায় কিছুই করতে পারে না। দাবার বোড়ে হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আর পারে কিছু গোষ্ঠীহীন সংখ্যালঘু মানুষকে পেয়ে, তেজ দেখাতে। তাদের যতো বীরত্ব কয়েকটা মানবতাবাদী সেক্যুলারের বিরুদ্ধে তর্জন-গর্জনে সীমাবদ্ধ।
আমি থাকছি, আমরা সেক্যুলাররা থাকছি আমাদের সেক্যুলার দেশে। যারা সেক্যুলার নয়, এ দেশের সংবিধান, এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা অপছন্দ হলে, তারা বরং দেশ ছাড়ুক।










