যত দিন যাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের দুর্ব্যবহার তত বাড়ছে। পরিচিত মানুষ, অপরিচিত মানুষ, চাক্ষুষ করা মানুষ, আন্তর্জালিক মুখচেনা মানুষ, আত্মীয়, অনাত্মীয় — কারো সঙ্গে মতানৈক্য হলেই ঢাল তরোয়াল নিয়ে নেমে পড়ছেন। তারপর কুকথা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, রুক্ষ ভাষা, অপরপক্ষের প্রতিটি আচরণের চুলচেরা ন্যায্যতাবিচার চলছে, চলতেই থাকছে।
অন্যপক্ষ সবল হলে রাশিয়া-ইউক্রেন সমরাঙ্গনে পরিণত হয় রাস্তা, পাড়া, ড্রয়িং রুম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার উঠোন — আর দুর্বল প্রতিপক্ষ হলে তো কথাই নেই, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ থেকে আরম্ভ করে শক্তিমান মুরুব্বি ধরে ‘অপমানকারী’কে শিক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা সবই শুরু হয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়া হলে পোয়া বারো — স্ক্রিনশট, পালটা স্ক্রিনশট, ট্যাগ, ত্যাগ সবই চলতে থাকে অপ্রতিরোধ্যভাবে।
কেন এত অসহিষ্ণুতা? কেন অন্যকে আঘাত দিয়ে এত সুখ? কেন আপাত সভ্যতার পথে এতদূর এগিয়ে এসেও এখনো let us agree to disagree লব্জ আত্মস্থ করতে পারছি না আমরা? সমস্ত বিষয়ে একটা জেনারেলাইজেশনের প্রবৃত্তি কেন এসে যাচ্ছে মানুষের মধ্যে?
উদাহরণ হিসেবে বলি, সম্প্রতি নারীর শ্রমের অধিকার বিষয়ে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন ছবি সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করছে, যেগুলি গভীর ভাবনার খোরাক জোগায়। প্রথম প্রথম অতটা জাজমেন্টাল মন্তব্য বা পোস্ট না দেখতে পেলেও, পরবর্তীতে বেশ কিছু ছবি এবং সেই সংক্রান্ত লেখা নিয়ে চাপান উতোর চোখে পড়ল। অবাক হলাম।
প্রত্যেকটি মানুষের অভিজ্ঞতা, যাপন, সমস্যা, প্রেক্ষিত এবং তার মোকাবিলা করার পদ্ধতি আলাদা। এটা যেমন শারীরিক রোগ সম্পর্কে প্রযোজ্য, তেমনই প্রযোজ্য সামাজিক পরিসরে। এইটুকু না বোঝার মতো বালখিল্য কি কেউ আছি?
জিম করবেটের লেখায় রয়েছে, একটি সাদামাটা, বোকাসোকা সরল মানুষের চিন্তাভাবনাও একটি অসামান্য বুদ্ধিমান বাঘের তুলনায় ঢের বেশি প্যাঁচালো।
অথচ, আমরা কত সহজেই মানুষ নামক এই সোশ্যাল অ্যানিম্যালের সামাজিক কাজকর্মের ঔচিত্য নিয়ে জাজমেন্টাল হই, সমালোচনা করি — যখনই নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মেলে না, তখনই নিদারুণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি। কেন বলুন তো?
ভদ্রভাবে, নম্র বাক্যে নিজের দ্বিমত প্রতিষ্ঠা করা কি একান্তই অসম্ভব? তাতে কি মনে হয়, উলটোদিকের মানুষটা (প্রতিপক্ষ?) আমাকে দুর্বল ভাববে?
সকল বিষয়ে একমত হওয়া কি সম্পর্কের সুস্বাস্থ্যের পরিচায়ক? তা কি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উপর সুবিচার করে?
জানা নেই। শুধু জানি, শৈশবে/কৈশোরে যে মূল্যবোধ চারিয়ে গিয়েছিল মনে, আজও সেগুলি আঁকড়ে থাকা হয়ত সামাজিক নির্বুদ্ধিতা। বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর কথা বলতে শিখছি আমরা, কোথায় থামতে হয় ভুলে যাচ্ছি। পরিমিতিবোধ, সংযম এইসব শব্দগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সুসভ্য সামাজিকতার অভিধান থেকে। আত্মসম্মান আর অহঙ্কারের ফারাক বুঝছি না, পার্থক্য করতে পারছি না দৃঢ়তা আর রূঢ়তায়।
অন্যকে হেয় করে মজা পাচ্ছি — নির্মল আনন্দ আর স্থূল শাব্দিক সুড়সুড়ি যে এক নয়, ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি সেই বোধ। সবচাইতে আতঙ্কের বিষয় হলো এই বেআব্রু পরমত অসহিষ্ণুতা কেবল অল্পবয়সী জেন জেডের প্রজন্মে নয়, মধ্যবয়সী প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে যাওয়া মানুষের মধ্যে আরো বেশি চোখে পড়ছে।
আপনারা বলতেই পারেন, তুমি কে হে প্রতি পদে অন্যের ভুল ধরে, মানুষের রুচি, আচরণ ঠিক করে দেওয়ার? সদাচারের পাঠশালা খুলে সকলের ঠেকা নিয়ে বসে আছো বুঝি?
ঠিক কথা, আমি কেউই নই।
মনে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এসেছে, সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম তাই। বাক্যবাণ, বায়বীয় লাথিঝ্যাঁটা সবই খাবার জন্য প্রস্তুত আছি। তর্কও করব না — তত বৈদগ্ধ্য নেই আমার। স্বল্প বীক্ষায় যা মনে হলো বললাম। একজন, দুজন কিংবা একশোজনও ভিন্নমত হতে পারেন — I will patiently agree to disagree….
এইটুকু গণতন্ত্র দেশীয় রাজনীতিতে আছে কি না বলতে পারব না, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো রয়েছে বলেই বিশ্বাস করি।
মাঝে মধ্যে শুধু উলটোদিকের ভিন্নমত মানুষটার সঙ্গে নিজের জুতোর অদলবদল করে নেওয়া প্রয়োজন। দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়, রজ্জুতে সর্পভ্রম বা মরীচিকা দর্শনের সম্ভাবনা কমে। 🙏
শুভ রাত্রি।








