কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ভয়হীন কাজের পরিবেশ অভয়া আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি বারবার নিজেদের কর্মক্ষেত্রে, হাসপাতালে নিগৃহীত হতে হয়েছে চিকিৎসক – নার্স – স্বাস্থ্যকর্মীদের, অনেক ক্ষেত্রেই চরম শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়ে রক্তাক্ত হয়েছি আমরা। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্ত মূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, শাস্তি পায়নি অপরাধীরা। সরকার বদলের পর আমাদের আশা ছিল পরিস্থিতি বদলাবে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে, ভয়হীন পরিবেশে কাজ করতে পারব আমরা। কিন্তু সরকার বদল হলেও পরিস্থিতি বদলাল না। পুঞ্চা থেকে জঙ্গিপুর – বারবার আক্রান্ত হয়েছেন চিকিৎসক-চিকিৎসকর্মীরা।
পেপার লিক এর প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনের সময় ধর্মতলায় নিগৃহীত হন কিছু সাংবাদিক। মুখ্যমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ গ্রেফতারির নির্দেশ দেন, বিধায়করা মিছিল করেন, সংবাদ মাধ্যমে হেডলাইন হয় সেই খবর। প্রায় একই সময়ে জঙ্গিপুরে আক্রান্ত হন এক চিকিৎসক, মারের চোটে মাথা ফেটে রক্তপাত হয় তার। কিন্তু সেই নিয়ে প্রশাসনের তরফ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, কোনও গ্রেফতারি হয় না, বড় মিডিয়া গুলোতে সে খবর আসেনি বললেই চলে, কোনও মন্ত্রী বা বিধায়ক এই ঘটনার বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনও বক্তব্যই রাখেননি। বারবার চিকিৎসক নিগ্রহ নিয়ে প্রশাসনের এই ঔদাসীন্য, নিরাপত্তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা – এ সবই আমাদের হতাশ করে, আহত করে।
নিরাপত্তাহীন পরিবেশে, যেকোন মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার উদ্বেগ নিয়ে কেউই নিজের কাজ ভালোভাবে করতে পারেন না। চিকিৎসা এমন একটি পেশা যাতে মানুষের জীবন বাঁচানোর, মানুষকে সুস্থ করার লড়াই চলে প্রতি মুহূর্তে। মানুষের শরীরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বহুক্ষেত্রেই খুব জটিল, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক রোগের ব্যাপারে সবকিছু এখনও জানিনা আমরা। তার মধ্যেও বহুক্ষেত্রেই অপ্রতুল পরিকাঠামোয়, সীমিত লোকবল নিয়ে মানুষকে সুস্থ করার জন্য লড়াই করি আমরা, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা। সে লড়াইতে সবক্ষেত্রে জিততে পারি না, অনেক ক্ষেত্রেই হার হয় আমাদের। কিছুক্ষেত্রে আমাদের ভুল ও হয়, আমরাও মানুষ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই যথাসম্ভব চেষ্টা করেও হেরে যেতে হয় আমাদের। এই হেরে যাওয়া আমাদের কষ্ট দেয়, অনেক ক্ষেত্রেই হতাশা নিয়ে আসে।
কিন্তু যথাযথ চেষ্টার পরও যদি গাফিলতির আঙুল ওঠে আমাদের দিকে, নেমে আসে শারীরিক অত্যাচার – তাহলে সে কষ্ট, সে বেদনার কোনও তুলনা হয় না। রোগীর জীবন – মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রাণ বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে আমরা সি পি আর দিই, আড্রেনালীন ইনজেকশন দিই; কোনও ক্ষেত্রে আমরা সফল হই, কোনও ক্ষেত্রে ব্যর্থ। কিন্তু সেই সিপিআর দেওয়ার পর নিজেকে আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত হতে হলে, আড্রেনালিন ইনজেকশন দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টাকে ভুল ইনজেকশনে রোগী মৃত্যু হিসেবে অভিহিত হতে দেখলে যে আঘাত পাই – তার চিকিৎসা আমাদের জানা নেই। রোগী এবং চিকিৎসক – কোনও যুযুধান পক্ষ নয়, চিকিৎসার কাজে দুজনেরই লক্ষ্য এক – রোগের নিরাময়, না হলে অন্তত রোগীর কষ্টলাঘব। কোনও চিকিৎসকই, আবার বলি কোনও চিকিৎসকই চান না এই লক্ষ্য পূরণ না হোক, কোনও চিকিৎসক ই চান না চিকিৎসা না পেয়ে বা ভুল চিকিৎসায় তার রোগী মারা যাক। বর্তমানের রোগী এবং চিকিৎসকের আস্থার সম্পর্কের অবনতিতে দুই পক্ষেরই কিছু ভূমিকা আছে হয়তো, কিন্তু তার থেকে অনেক বড় ভূমিকা আছে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর যাদের প্রচারে প্রভাবিত হয়ে যে কোন মৃত্যুই চিকিৎসার গাফিলতির কারণে হয়েছে বলে আজ আমরা মত দিই।
পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এই বাতাবরণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে, হাসপাতাল – নার্সিংহোমে এই হিংস্রতা আমাদের আটকাতে হবে। যেকোন পেশার মানুষের মত আমাদের ও ভুল হয়, কাজে গাফিলতি থাকতে পারে। গাফিলতি মনে হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পথে অভিযোগ হোক, যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা হোক। কিন্তু হাসপাতালে হিংস্রতা দেখিয়ে, চিকিৎসক – স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে, কর্মক্ষেত্রে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে কোনও সুরাহা হয় না, বরং ভয় এবং উদ্বেগের পরিবেশে ব্যাহত হয় চিকিৎসা, হাসপাতালে তাণ্ডব চালানো কিছু দুষ্কৃতীর কুকর্মের ফল ভোগ করেন রোগী-চিকিৎসক। রোগীর সুস্থতার জন্য, সঠিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে সুস্থ কাজের পরিবেশ, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মক্ষেত্র অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতালে নিরাপদ, ভয়হীন কাজের পরিবেশের জন্য সরকার দায়বদ্ধ হোক, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার দাবিতে রোগী এবং চিকিৎসক মানুষ হয়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক।
#wbjdf #SayNoToViolence #healthworkers
b










