খুস্খুসে কাশি ঘুষ্ঘুষে জ্বর, ফুস্ফুসে ছ্যাঁদা বুড়ো তুই মর্। মাঝ রাতে ব্যথা পাঁজ্রাতে বাত, আজ রাতে বুড়ো হবি কুপোকাত!
মানুন বা না মানুন, টিবি অথবা যক্ষা রোগের সবচাইতে ভালো বিবরণ দিয়ে গিয়েছিলেন সুকুমার রায়। হযবরল তে।
*******
“ডকুমেন্টরি না হে সব্যসাচী। শকুমেন্টরি দিতে হবে এদের। ধরে ধরে শালা শক দিতে হবে জনতাকে।”
এমত কথা আমাকে বলেছিলেন আমার এক ঊর্ধ্বতন কর্তা, এগরোলের কাগজ ছাড়িয়ে ভাগ করে খেতে খেতে। আর বলেছিলেন– টিবি নিয়ে লিখলেই, বা বেকারত্ব নিয়ে বই বের করলে, বা খুঁতখুঁতালেই মহান হওয়া যায় না, বুঝলে দাদা! পথে নেমে কাজ করতে হবে।
–
টুম্পা দেবনাথ আমার হাসপাতালে এসেছিল দুইহাজার এগারো সালের এক শীতের দুপুরে। বাতাসে তখন কুয়াশা-কাতরতা।
তৎকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিস্থিতি মাফিক স্রেফ এটুকুই জানতে পেরেছিলাম আমরা যে টুম্পার, টিবি রোগ সারছে না তামাম ওষুধ খেয়েও।
হ্যাঁ বড় আশ্চর্য সেসব সময় বটে! অথচ হিসাব কষে যদি দেখি– এসব কথা তো, এই তো বছর বারো মাত্র পূর্বেই। যখন উপায় ছিল না, টুম্পার আসল বেমারী খুঁজে বের করার। হ্যাঁ, ছিল না তখন তাবড় বেসরকারি পরিকাঠামোতেও। কিংবা… হয়ত ছিল। যেমনটা বরাবর বরাদ্দ হয়ে এসেছে স্রেফ ধনকুবেরদের নিমিত্ত।
কিন্তু টুম্পার ভাগ্য ছিল ভালো। টুম্পা ভর্তি হওয়ার ঠিক মাস পাঁচেকের মধ্যেই সরকারি খাতে, বিনা পয়সায় নির্ধারণ করার সুযোগ এসে গেলো, টিবি রোগটি ড্রাগ রেজিস্টান্ট কিনা! অর্থাৎ, সাধারণ ভাবে ব্যবহৃত ওষুধপত্র এ রোগে কার্যকরী হবে, নাকি না! প্রয়োগ করতে হবে আরো ‘কড়া’ ওষুধ।
বিষয়টা একটু খুলে বলা যাক। কচকচি হবে জেনেও, বলা যাক। বিশদে। টিবি/ যক্ষা রোগটি আদতে কী? এ রোগ আদতে একটি আণুবীক্ষণিক–জীবাণু-বাহিত বেমারি। যে জীবাণুটির খটমটো নাম– মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলসিস। যে জীবাণুঘটিত মৃত্যুর খবর মিলেছে – বিজেপি বাজে, তৃণমূল তুচ্ছ, সিপিয়েম- শয়তান তরজারও বহু পূর্বে। বহু বহু বৎসর পূর্বে। যখন রাজত্ব করতেন মিশরে ফ্যারাওরা। সেই তখনও দিব্যি ত্রাস স্বরূপ ছিল এই জীবাণুটি।
আর তারপর পেরিয়ে গিয়েছে হাজার দুই বছর। তাবড় তাবড় বৈজ্ঞানিক, তামাম জগৎ ঢুঁড়ে খুঁজে বের করে এনেছেন এ রোগের চিকিৎসা। এক কথায় যেগুলিকে বলা যায় – এন্টিবায়োটিক। লেকিন হায় আল্লা, সমস্ত, তাবৎ, সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই বছর ঘুরতে না ঘুরতে ঢাল বানিয়ে নিয়েছে এই টিবির জীবাণু ব্যাটাচ্ছেলে।
বুঝিয়ে বলি।
ধরুন আপনি যুদ্ধক্ষেত্রে। দুশমন পাথর ছুঁড়ছে নিশানা হেনে। আপনি পরে নিলেন শিরস্ত্রাণ। আর তাই জিতে গেলেন। অতঃপর দুশমন আরো তেজি হলো। হানলো– সূঁচালো বর্শা। আর আপনি আড়াল খুঁজে নিলেন নিরাপদ লৌহ বর্মে। এবং চললো এরকমই। অর্থাৎ …ও বন্দুক তো আপনি বুলেট প্রুফ, ও ফাইটার-জেট তো আপনি বিমান-বিধ্বংসী বন্দুক। যত তীব্র আক্রমণ, তত দৃঢ়তর কেল্লা।
টিবির ব্যাকটেরিয়া মোটের ওপর এমনই। যতই হুঙ্কার দিন, সে ব্যাটা ঠিক খুঁজে নেবে বেঁচে থাকার পথ।
অর্থাৎ, লড়াইটা অসম। আর ঝঞ্ঝাটের। কিন্তু লড়াই চলছে। চলেই যাচ্ছে। মানুষ আর মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলসিস-এর।
****
তো সে যাই হোক, টুম্পা যখন এলো আমার এই হাসপাতালে, তখন সদ্য শুরু হয়েছে, ব্যাকটেরিয়ার রেজিস্ট্যান্স (কোন ওষুধ কাজ করবে) দেখার পদ্ধতি। এবং বিনামূল্যে। এবং বিনামূল্যে। এবং বিনামূল্যে। তিনবার বললাম কারণ সেই একই টেস্টের তখন বেসরকারিতে খরচ দুই হাজার টাকাv(সাল–2011)।
মেডিক্লেমানো, ফেসবুকানো আর সরকার-খিস্তানো আপনারা যদিও এসব বুঝবেন না। বুঝবে তারা, যারা সকলই সমর্পণ করেছে সরকারিতে।
******
টুম্পা ততদিনে খেয়ে ফেলেছে ২৪ মাস টিবির ওষুধ। অর্থাৎ দুই বছর। খেয়েছে – ক্যাট ওয়ান ছয় মাস আর ক্যাট টু নয় প্লাস নয় আঠারো মাস (এত কচকচি না বুঝলেও চলবে)। মোটমাট কথা, তৎকালীন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান নির্ভর চিকিৎসা, যাকিছু উপলব্ধ, তার জন্য বেচারির দুই বছর চলে গেছে জীবনের।
আর তারপরেই কামাল। বিনামূল্যে বিজ্ঞানের নতুন দরজা উন্মুক্ত করলেন সরকার। টুম্পার কফের নমুনা পাঠানো হলো বিশদ পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে সময় লাগে, মাস পাঁচেক। না, সরকারি গড়িমসির জন্য এই বিলম্ব নয়। বিলম্ব, বিজ্ঞানের তৎকালীন পরিস্থিতির নিমিত্ত।
তা এলো। মাস পাঁচেক পরে সেই রিপোর্ট। চিকিৎসা চললো আরো আঠারো মাস।
খেয়াল রাখবেন, চব্বিশ+পাঁচ+আঠারো= ৪৭ মাস। অর্থাৎ চার বছর। লড়াই করলো টুম্পা।
এবং সারলো না তারপরও। টিবি ব্যাকটেরিয়া ততদিনে নিজের খোলনলচে বদলে নিয়ে দুর্দম, দুর্মদ হয়ে গিয়েছে আরো। আর সেই দুর্দমনীয়তার শিকড় খুঁজতে… খুঁজে পেতে, বিজ্ঞানকে লড়াই করতে হয়েছে বিষম। এবং সেই লড়াই থেকে প্রাপ্ত ব্রহ্মাস্ত্রকে ‘ বিনামূল্যে’ করতে যুদ্ধ করতে হয়েছে সুতীব্র।
জগৎময় ভারতীয় তখনও সিপিএম নিপাত যাক, বিজেপি বেটার, কংগ্রেসই কিং করে যাচ্ছে।
এসব সত্ত্বেও এলো বিনামূল্যে আরো দুর্মূল্য টেস্ট। আর সেই টেস্ট, যার রেজাল্ট আসতে সময় লাগে আরো মাস ছয়, সেই টেস্টের রিপোর্ট এলো। টুম্পা ওষুধ খেলো সেই রিপোর্ট মাফিক আরো আঠারো মাস।
এবং সুস্থ হলো। অবশেষে।
৪৭+৬+১৮ অর্থাৎ প্রায় ছয় বছর পর।
টুম্পা বিষয়ে আর যা কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সেসব আপাতত তুলে রাখছি অন্য একদিনের জন্য।
মোট কথা, টুম্পার রোগটি নির্ণয় করতে সময় লেগেছিল তখন বছর পাঁচ।
*****
২০১১ থেকে ২০২৪
এই বারো বছরে সরকরী পাশা বদল হয়েছে বিস্তর। বাম, ডান, মিলিজুলি। সেসবে মনোনিবেশ করতে চাইলে করুন। কিন্তু ভেবে দেখবেন, টুম্পার যে রোগ ধরতে সময় লেগেছিল ৪৭ মাস, তা এখন নির্ধারণ করতে সময় লাগে চব্বিশ ঘন্টা। আর যে রোগটি ধরতে সময় লেগেছিল তিপান্ন মাস তা এখন…তিন মাসেই মুঠোয় হাতের। এবং এবং এবং বিনামূল্যে।
****
রাজনীতি রঙ পরে থাকার দিকদারি কোথায় জানেন বাবুসাহেব/বিবি-সাহিবাঁ? আপনি খুঁত ধরবেন। ধরতেই থাকবেন যদি মসনদে থাকে আপনার বিরোধী পক্ষ। আর যদি থাকে মনপসন্দ পার্টি…তাহলেই “সাদা ধুতি দাগহীন, পার্টি আমার হুড রবিন” জিগির চালাবেন।
****
কেন এত কথা বললাম? অতি সম্প্রতি টিবির ওষুধের অপ্রতুলতা নিয়ে একমুখী বক্তব্য পেশ করছেন কিছু মানুষ। তাঁরা বুঝতেও পারছেন না যে তাঁরা আদতে সরকার বিরোধিতা করতে গিয়ে বকলমে জনতাকে করে দিচ্ছেন সরকারি চিকিৎসা বিমুখ।
হ্যাঁ হয়েছিল টিবির ওষুধ অপ্রতুল। কিন্তু এক্ষেত্রে ডান-বাম-দিশাহীন কোনো সরকারেরই অশুভ আঁতাত ছিল না। দেড়শ কোটি মানুষের জন্য বিনামূল্যে যদি সরবরাহ করতে হয় ঔষধ, তবে একটিবারের জন্য হলেও সেই ব্যবস্থায় ভাঙন ধরতে পারে অযাচিত। সামান্য পাঁচশ নিমন্ত্রিতদের বিয়েবাড়িতেও খাসির মাংস খতম হয়ে যায় কখনো কখনো। তাতে নিমন্ত্রণ কর্তার অশুভ উদ্দেশ্য থাকে না কভু। হ্যাঁ কিছু বখাটে পিচিক করে থুতু ফেলে বলে থাকে বটে– শ্বশুরটা শালা কিপ্টে।
****
আপনি বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, টিবির এক এবং একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত বিনামূল্য চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে যেকোনো রঙ/পার্টির ভারত-সরকার। আগামী ডিসেম্বরে আমার চোদ্দ বছর পূর্ণ হবে টিবি চিকিৎসক হিসাবে। আমি পার্টি করি না। ঘুষ খাই না। ঠুলি পরে থাকি না। আর তাই আমি জানি– সরকারি চিকিৎসাতে প্রতিবন্ধকতা আছে অবশ্যই। লম্বা লাইন, খিঁচুটে ডাক্তার, নোংরা বিছানা…আর চোদ্দ বছরে একবার ওষুধ অপ্রতুলতা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনি ওষুধ খেলে, টেস্ট করালে, ভর্তি থাকলে আমার/আমাদের পকেট ভর্তি হবে না।
ভরসা রাখুন। জানি, এখনো কোথাও কোথাও হয়ত, হ্যাঁ হয়ত টিবির ওষুধ অপ্রতুল…কিন্তু এসব মিটে যাবে। আমি লড়ছি। আমরা লড়ছি। ভরসা রাখুন। ভারত সরকার, রাজ্য সরকার সব্বাই প্রভূত অর্থ ব্যয় করছেন স্রেফ এ চিকিৎসাকে নিশুল্ক আর সুলভ করবেন বলে। তা তাঁদের রঙ যাই হোক না কেন।
****
পরিশেষে আবারও
টুম্পার যে রোগ ধরতে সময় লেগেছিল বছর তিন, তা এখন চব্বিশ ঘন্টায়। বিনামূল্যে। প্রাইভেটে– ছয় হাজার টাকা।
আর টুম্পার চিকিৎসার জন্য মোট আনুমানিক যে পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল তা এখনো বিনাপয়সায়।
আর, শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও ভারত তথা রাজ্য সরকার টিবির সবচাইতে কার্যকরী ওষুধটিকে (বাজারে দাম একটি কোর্সের দাম প্রায় এক লাখ টাকা) বেসরকারি হতে দেননি।
(যক্ষা হবে নাকি যক্ষ্মা , এই বানান নিয়ে তরজা স্বাগত)











