এগারো দিনে একটিবারও এস.টি.ডি ফোনকল না পেয়ে উৎকন্ঠিত পিতা আমার, তিনশ তেইশ কিলোমিটার ডিঙিয়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে।
আমার বয়স তখন একুশ। আর বাবার বিয়াল্লিশ।
কলেজ ক্যাম্পাসে পা দিয়েই শিহরিত হয়েছিলেন সেই বিয়াল্লিশ বৎসরের ঘর-গোছানী পিতৃদেব। পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ এ কলেজের সমস্ত দেওয়াল–
অবিলম্বে গ্রেফতার চাই।
আর সেই গ্রেফতারি দাবিতে আরও পাঁচটি নামের মধ্যে তিন নম্বরে জ্বলজ্বল করছে আমার নাম– সব্যসাচী সেনগুপ্ত।
অসহায় পিতা আমার, হড়বড় করে খোঁজ নিতে এসেছিলেন হোস্টেলে। যে হোস্টেলে থাবা মারতে উদ্যত এস.এফ.আই -এর সাথে আক্ষরিক অর্থেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে গত রাতের আগের রাত্তিরেই। আমাদের।
আমরা। যারা সিপিয়েম না। বিজেপি না। কংগ্রেস কিংবা ঘাসফুল না। আমরা আমরাই। আমরা ছাত্রদল। এবং আমরা বিলক্ষণ জানি যে, সরকারি মদত পুষ্ট ‘ওরা’ এবার, ভাড়াটে গুন্ডাদল-কে পাঠাবে। আজ সেটা অর্থাৎ ওরা বামপন্থী হতে পারে, কাল ডান, পরশু মধ্যম। কিন্তু, পাঠাবে। গুন্ডাদল। শাসকেরা। শাসন করতে চায় যারা।
ইঞ্চি ইঞ্চিতে তাই গড়ে তুলে নিচ্ছি, আমরা– প্রতিরোধ।
এবং ঐ তখনই বাবা এলো আমার। এলো অচেনা মুখ। অপরিচিত ব্যক্তি।
চিৎকার শুনলাম ‘দ্বারপাল’-এর–এ-সে-ছে।
আর ইট তুলে বেরিয়ে এলাম আমি। পরনে স্রেফ গামছা। মুখে, খিস্তি– মার শালাকে।
‘বাবা’কে দেখে তৎক্ষণাৎ গুটিয়ে গেলাম যদিও। ধড়াকসে রুমে ঢুকে বারমুডা গলিয়েই আবার আবির্ভুত হলাম এঁটো হেসে– ও ও ও বাবা তুমি! এসো!
হতভম্ব পিতা আমার সেদিন বলেছিলেন তুৎলিয়ে– তুই…গ্রেফতার…ডাক্তার হতে পাঠিয়েছি…।
তোতাই পাতাই করে ভুলভাল বুঝিয়ে বাবাকে ফেরত পাঠিয়েছিলাম সেদিন। আর অভিজিৎদা গামছা পরে পোঁদ চুলকাতে চুলকাতে এসে বলেছিল– ডাক্তার! আগে মানুষ হ বে! আগে মানুষের মত মানুষ হ।
††***
নাইট অনকল-এ গিয়েছিলাম রোগী মুমূর্ষু রোগীকে দেখতে। ওষুধ-এডভাইস, পার্টি ম্যানেজমেন্ট এসব সেরে ফিরতে ফিরতে রাত তখন বাজে, পৌনে তিনটে প্রায়। শহর জলপাইগুড়ির পথ ঘাটে যখন কেবলই কুকুর আর বন্ধ শাটার দোকানঘর।
আচমকা হলদেটে হেডলাইটে দেখতে পেলাম গোটা দশেক অস্পষ্ট অবয়ব। মনুষ্য মূর্তির। আর কানে এসে পৌছালো – “…ধাতা”।
কিছুটা এগোনোর পরেই যদিও স্পষ্ট হল সবটা। গোটা ছয় সাত ছেলেছোকরা। মনে মনে যাদের আমরা – ‘ছেলেপুলে’ বলে থাকি। কিংবা জলপাইগুড়ির ভাষায় ‘চ্যাংড়া ব্যাংড়া’। তো সেই চ্যাংড়া ব্যাংড়াদের একটা দলই আজ হেঁটে বেড়াচ্ছে শুনশান সড়ক পথে। বেশিরভাগেরই উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। শ্যেনদৃষ্টিতে দেখলাম , ওরা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছে স্রেফ। আর একজনের তো সেই স্যান্ডোটিও মাথায় জড়িয়ে রাখা রয়েছে ঘোমটার মত।
বয়স তো হল। আমার। বয়স তো হলো বিয়াল্লিশ। তাই চিনতে ভুল হয় না। এরা স্রেফ চ্যাংড়া ব্যাংড়া নয়। এরা ছাত্র। জলপাইগুড়ি মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের। কথাবার্তায় ভিন্ন জেলার আর ছাত্র-ঔদ্ধত্যর ভাব সুস্পষ্ট।
এরা, এই উদ্ধত ছাত্ররা বস্তুত জাতীয় সঙ্গীত গাইছে। সুস্পষ্ট সিগারেট ঠোঁটে। স্পষ্টতর হয়ে উঠছে–
“…ভাগ্যবিধাতা/ পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাটো মারাঠা…। ”
***
ঠিক যে মুহূর্তে পেরিয়ে গেলাম ওদের ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে তখনই সে ‘গান’ পাল্টে গিয়ে হয়ে গেল– টুম্পা সোনা, দুটো হাম্পি দে না। জিও জিও চিৎকার উঠলো জলপাইগুড়ি জনপদ কাঁপিয়ে জবরদস্ত, আর একজন মুখভঙ্গি করল আমাকে – কী দেখছ? কাকু? বাঁড়া?
ঝটকা লাগল। বিঁধল। তীব্র, তীক্ষ্ণ, তীরের মতো…ধাক্কা। আর হাসি ফুটে উঠল হেলমেটের নীচে প্রশ্রয়ী। আমার। হাসি; নস্টালজিক-নষ্টামির। যেমত পিতা হাসেন, হাতেনাতে ধরা পড়া সন্তানের প্যান্টের পকেট হাতড়ে মাতড়ে যখন সিগারেটের প্যাকেট বের করে আনেন জননী। কিংবা উদ্ধার হয় নিষিদ্ধ ম্যানিফেস্টো।
হ্যাঁ। সকলই এক। সিগারেট যেমত, তেমনই রেডবুক। জনগনমন যেমন, তেমনই টুম্পার হামপি।
রাজদ্বারে যেমত, সেমত শ্মশানেও।
এমনই ছিল। এমনই ছিল।
আমার আপনার সব্বার। হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। সেসব আলবাত ছিল একদিন। ছিল। উদ্ধত। দিকদারি বিহীন।
বেশ মনে পড়ছে এখন আমারই আমার রাজপথ- রাজত্বের কথা।
বছর বাইশ পূর্বে একদা আমরাও স্লোগান তুলেছিলাম কোটা/রিজার্ভেশনের বিরুদ্ধে। স্তব্ধ হয়েছিল সেদিন কলকাতার রাজপথ। মিছিলের মাথা যখন এসপ্ল্যানেডে, লেজ তখনো তৎকালীন ‘হিন্দ’ সিনেমাহল ক্রস করছে। সে মিছিলের পুরোভাগে চিল্লাছে তন্ময়–
এ…এ বুদ্ধ ভটচাজ নিপাত যাক!
এএ এ… আমরা কারা… ছাত্ররা…।
তন্ময়ের কাঁধ খামচে আমি বলছি, –বুদ্ধকে আরো খিস্তি দে শালা, আর সঙ্গত দিচ্ছে সৌগত– হ্যাঁ, দে শালা বুদ্ধ কে… আর তুই সব্য, কাউন্টার দে ভাই সিগারেটের।
আপাত-সামান্য শোনালেও ঘটনা কিন্তু, গুরুতর। মাত্র মাস তিনেক আগেই এন্টিশিপেটরি বেল/ আগাম জামিনে ছাড়া পেয়েছি আমরা। এই আমি, সৌগত আর একটু পিছিয়ে পড়া সুজয়। যে সুজয় তখন, সে সময়ে ছিঁড়ে যাওয়া চপ্পলে সেফটিপিন গাঁথার জন্য প্রত্যেক মোড়ের দোকানে বলে যাচ্ছে– “সেফটিপিন আছে? হ্যাঁ?…এএই সিপিয়েম নিপাত যাক।”
এ বাদেও মিছিলের পুরোভাগে যারা চিল্লিয়ে যাচ্ছে তখন ভয়ডরহীন, তাদেরকেও কলেজ কর্তৃপক্ষ শাসিয়ে রেখেছে– একটু বেগড়বাই হলেই, রাস্টিকেট করে দেওয়া হবে।
অথচ তারা বেরিয়েছিল। বেগড়বাই করেছিল। ছড়ছড়িয়ে মুতে দিয়েছিল প্রকাশ্যে, শাসকের শাসানি-তে। আর হেসেছিল অপাপবিদ্ধ– ওই ওই দ্যাখ বাল, সি.জে.ডি স্যার যাচ্ছে চেম্বারে প্র্যাকটিস করতে…এ বাল… সি জে ডি কাকু নিপাত যাক।
কাকু, সম্মানার্থে নয়। কাকু বরং টিটকারি মেরে। কাকু অর্থাৎ তার কাকিমা আছে। আছে ভাইপো ভাইজি বাচ্চাকাচ্চা। গাড়ি আছে। আছে ফ্ল্যাট। আর তার চাইতেও জরুরি হলো যে রয়েছে তার জাগতিক মোহ মায়া।
যা আমাদের তখন ছিল না। যা আমার এখন রয়েছে।
ছাত্রদের রাজনীতি করা কাঙ্খিত অথবা অনাকাঙ্খিতর চাইতেও বড় বিষয় এইটাই যে ছাত্ররা দুনিয়াদারিতে ভেসে থাকে না। তারা ধার ধারে না সালতামামির। মরে গেলে মরে যাব ‘ বাড় খেয়ে’, তবুও যা করতে চাই, করব সেটাই।
আমার প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ছাত্র আন্দোলন জমাট বেঁধেছে সম্প্রতি। ছয় জন নিহত (সরকারি মতে)। আহত শতাধিক। সরকার মদত পুষ্ট একদল গুন্ডা কার্যত বহুতল ছাদ থেকে ঠেলে মাটিতে ফেলে মেরে ফেলে দিচ্ছে প্রতিবাদীদের (সেই খবর সরিয়ে দেওয়া হয়েছে)।
কিন্তু তবু কিছু তো হচ্ছে। গর্জে উঠছে। গর্জে উঠছে তারা, যাদের বাপ মা বান্ধবী/ বান্ধব দের উর্দ্ধে থাকে প্যাসন। যারা মাথা নোয়ায়নি। যারা গর্জে উঠেছে।
হালুম।
আর আমি ফেসবুকে বক্কা মারছি। আমি। অর্থাৎ কাকু।
আর সেই বক্কা থেকেই বলতে চাই, যেকোনো রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি হত্যার দায়িত্ব সেই রাষ্ট্রনায়ক/নায়িকা…সরকারেরই।
জবাব দিন। দিতেই হবে। বাংলা দেশের সরকার। আপনাকে।
যে দেশে ছাত্ররা মরে যায় সে দেশ ভারত হোক, পাকিস্তান হোক বা বাংলা দেশ, সে দেশ–বধ্যভূমি। সে দেশ ফ্যাসিস্ট। আমি থুতু ফেলি সেই রাজ রাজ রাজ তন্ত্রে।
আর হতাশ লাগে, কাকু হিসাবে ফেসবুক বক্কা মারতে।









