এই পোস্টটি যখন লিখছি সারা রাজ্য জুড়ে উদ্বেলিত গণ আন্দোলনের মাঝে জুনিয়র ডাক্তার দের দৃঢ়কল্প মিছিল লালবাজারের অনেক আগেই আটকে দিলে তাঁরা রাজপথে অবস্থানে অনড়। তাঁদের দাবি তিলোত্তমার বিরুদ্ধে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার এক অন্যতম চক্রী দলদাস পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের অপসারণ। অন্যদিকে সন্দীপ মাফিয়াকে তিলোত্তমা পৈশাচিক হত্যার ঘটনায় নয় দুর্নীতির দায়ে সিবিআই গ্রেফতার করেছে।
গত পরশু জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস এর উজ্জীবিত সিজিও কমপ্লেক্স অভিযানের পর সংবাদ মাধ্যমে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সিবিআই নাকি জানিয়ে দিয়েছে যে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর তারা সুপ্রিম কোর্টে বন্ধ খামে বড় নাম পাঠাবেন। তারা কি পাঠাবেন তারাই জানেন, কিন্তু এরকম তারা বলেছেন বলে মনে হয়না। আর যদি বড় নামও পাঠান দিদি – মোদি বোঝাপড়ায় সেটি চন্দ্রচূড়বাবু প্রকাশ করবেন কিনা এবং প্রকাশ করলেও তাকে কিছু করা হবে কিনা আমাদের জানা নেই। সারদা থেকে বোগটুই হয়ে কালীঘাটের কাকু অবধি কোন কেসেই সিবিআই কালীঘাটের পুঁতি গন্ধময় পচা নালাটি এখন অবধি পার হতে পারেনি।
সমস্যাটা অন্য জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের গলা টিপে ধরেছিল নাৎসি নেত্রীর নেতৃত্বে যে মাফিয়া – অপরাধ তন্ত্র, তার একটি সিন্ডিকেটের দ্বারা আরজিকর মেডিকেল কলেজে ডিউটিরত অবস্থায় শ্রমজীবী পরিবারের মেধাবী একমাত্র সন্তান স্নাতকোত্তর চিকিৎসক তিলোত্তমাকে যে বীভৎস অত্যাচার করে ধর্ষণ ও খুন করে লোপাট করে দিয়ে পুরো ঘটনাটা ধামাচাপা দেওয়ার যাবতীয় অপচেষ্টা করা হয়। আর এর বিরুদ্ধে প্রথমে আরজিকরের জুনিয়র ডাক্তাররা রুখে দাঁড়ান। তারপর অন্য জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তাররা। গর্জে ওঠে সারা বাংলা, সারা ভারত, সারা বিশ্ব। নাৎসি নেত্রীর চটিচাটা পুলিশ ডাক্তার ও আন্দোলনকারীদের উপর লাঠি চালিয়ে, আরজিকরের আন্দোলনকারীদের ও হাসপাতালে তাণ্ডব চালাতে তৃণমূলী লাম্পেনদের ব্যবস্থা করে দিয়ে কিংবা নাৎসি নেত্রীর মিথ্যা আন্দোলন – নাটক থেকে হুমকি কোন কিছুই এই প্রতিবাদী গণ জাগরণ কে রুখতে পারেনা। ‘ তিলোত্তমার বিচার চাই ‘ দাবিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়, আবালবৃদ্ধবনিতা পথে নেমে প্রতিবাদের ঢল বইয়ে দেন।
এই আন্দোলন অভূতপূর্ব। কিন্তু আন্দোলন তো এভাবে চিরকাল চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। আন্দোলনকারীদের দাবিমত কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি যখন অপদার্থ পুলিশ প্রশাসনকে ভর্ৎসনা করে সন্দীপ মাফিয়াকে পত্রপাঠ ছুটিতে পাঠিয়ে সিবিআই কে তদন্তভার দিয়ে সময়সীমা জারি করে আশার সঞ্চার করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী চন্দ্রচূড় জুনিয়র হঠাৎ করে সুমো মোটো কেসটি নিয়ে সময় খাইয়ে নাৎসি নেত্রীর সুবিধা করে দিলেন। জনগণের অমূল্য টাকায় সামনে সিব্বল ও পিছনে সিংভিকে রেখে নাৎসি নেত্রী তার অনুপ্রেরণাধন্য অপরাধীদের বাঁচানোর খেলায় নামলেন যা তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে করেন। তারপর সিবিআই নতুন কাউকে হেফাজতে না নিয়ে দীর্ঘ ২৪ দিন জিজ্ঞাসাবাদ ইত্যাদি করে চলল।
ব্যাপক হতাশার জন্ম হলেও চিকিৎসকরা এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিন্তু লড়াই ছাড়েননি। তারা বিচারের সাথে দুর্নীতি এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রর বিষয়টি যুক্ত করে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিলেন, চালিয়ে গেলেন। ফলে এই উত্তপ্ত পরিস্হিতি প্রশমিত করতে শাসককে প্রিয় অনুচর সন্দীপ মাফিয়া আর বিনীত গোয়েলকে হয়তো আপাতত আহুতি দিতে হল বা হবে। কিন্তু তিলোত্তমার বিচার কি হবে? ঘাতক, ধর্ষক, ষড়যন্ত্রকারী, মূল চক্রীরা কি শাস্তি পাবে? এই বিষাক্ত পরিবেশ, অপরাধ তন্ত্রের কি পরিবর্তন হবে? এগুলিই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
৯ আগষ্টের কালো রাতে সঠিক কি হয়েছিল আততায়ী ও ষড়যন্ত্রকারীরা জানে আর সিবিআই জানার চেষ্টা করছে। তবে আপামর জনগণের অনুমান নাৎসি নেত্রীর অনুপ্রেরণাধন্য কুখ্যাত নর্থ বেঙ্গল লবির অন্যতম সেনাপতি সন্দীপ মাফিয়ার ডাক্তার নামের কলঙ্ক গুণ্ডা ঘাতকবাহিনী তাদের তোলাবাজি, দুর্নীতি, অনৈতিক ও নোংরা কাজকর্মের প্রতিবাদ করায় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে বীভৎস অত্যাচার করে ধর্ষণ করে হত্যা করে। এর কোন পর্যায়ে হয়তো সন্দীপ মাফিয়ার আরেক সাকরেদ ওই লুচ্চার চটিপুলিশ টিকে যুক্ত করা হয়। এরপর যতোটা পারে প্রমাণ নষ্ট করে, ডিউটিরত স্বাস্থ্য কর্মীদের ভয় দেখিয়ে চুপ রেখে দেহটি সেমিনার রুমে ফেলে দেওয়া হয়।
এরপর চলে আরেক নারকীয় খেলা যার ভিডিও ফুটেজ ইত্যাদি রয়েছে। সকাল নটা নাগাদ সন্দীপ মাফিয়ার আহ্বানে অপরাধ সিন্ডিকেট এর তাবড় সেনাপতিরা সুশান্ত রায়, সুদীপ্ত রায়, কৌস্তুভ নায়েক, অভিক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, সঞ্জয় বশিষ্ঠ প্রমুখেরা এবং তাদের আইনি, ফরেনসিক, ডিজিটাল পরামর্শদাতারা হাজির হয় এবং পুরো বিষয়টি ধামাচাপার ব্যবস্থা করে। দলদাস পুলিশ তাদের নিজ দায়িত্ব পালন না করে ওই ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে পড়ে। সন্দীপ বাহিনী পুলিশের সাহায্যে মৃতদেহটি গায়েব করার চেষ্টা করে। অতীতে তারা এসব অনেক করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিলোত্তমার সহকর্মী জুনিয়র ডাক্তাররা। তখন বাবা মাকে না দেখতে দিয়ে আত্মহত্যার দৃশ্য সাজানোর চেষ্টা করা হয়। তাতেও ব্যর্থ হয়ে প্রভাব খাটিয়ে মৃতদেহ ভালো করে সংরক্ষণ না করে ও সঠিকভাবে ময়না তদন্তের ব্যবস্থা না করে দ্রুত নাম কো ওয়াস্তে সুরহতাল ও ময়না তদন্ত করে দেহটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরো অন্যায় ও বেআইনি বিষয়টি তত্বাবধান করা হয় প্রসাশনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে পুলিশ, স্বাস্থ্য প্রশাসন ও তৃণমূল নেতা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। সাজানো এফআইআর করা হয় অনেক পরে। আর পুরো দায়ভার চটিপুলিশ টির উপর চাপিয়ে নাৎসি নেত্রী এবং যুবরাজ তার ফাঁসি ও এনকাউন্টার এর নিদান দেন।
এখানেই শেষ নয়। অকুস্থল গোপনে ভেঙ্গে ফেলা হয়, আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানো হয়, তিলোত্তমার পরিবারকে উৎকোচ দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা হয় এবং ১৪ তারিখ তৃণ লুম্পেনদের পাঠিয়ে পুরো হাসপাতাল টাই তছনছ করে দেওয়া হয়।
প্রবল গণ আন্দোলনের আবহে দীর্ঘ তদন্তের পর সিবিআই প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে, গ্রেফতার করে, আদালত প্রামাণ্য চার্জ সিট দিতে পারলে ভালো। কিন্তু নোবেল মামলা থেকে নিয়োগ দুর্নীতি, শিক্ষা দুর্নীতি ইত্যাদি মামলার মত সিবিআই যদি পুনরায় ব্যর্থ হয় বা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান নেয় তাহলে বিলম্বিত বিচার কার্যত বিচারকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করবে। আর সিবিআইও যদি দলদাস পুলিশের মত সঞ্জয় রাই কেই একমাত্র অপরাধী চিহ্নিত করে তাহলে কার্নিভালের আগেই আবার নাৎসি নেত্রীর তাণ্ডব নৃত্য দেখতে ও আবোল তাবোল কথা শুনতে হবে, ফোস ফাঁস বেড়ে যাবে তার বিষাক্ত সাপেদের।
তবে যাই ঘটুক না কেন স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে এই শান্তিপূর্ণ নাগরিক গণ জাগরণ এবং জুনিয়র ডাক্তারদের প্রত্যয়ী গণ আন্দোলন। যা কিনা প্রতিবেশী বাংলাদেশের আন্দোলনের হিংসা, লুঠপাট, মৌলবাদী ধর্মীয় আগ্রাসন, সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যার কলঙ্কতে কলঙ্কিত নয়। তিলোত্তমা আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু এই মহান আন্দোলনের পথ ধরে আমরা আর তিলোত্তমা কাণ্ড ঘটতে না দেওয়ার সাহস পাবো, সাহস পাবো মাফিয়া – অপরাধতন্ত্রের কালো হাত গুড়িয়ে দিতে।
তিলোত্তমার বিচার চাই!
জুনিয়র ডাক্তার এবং নাগরিকদের আন্দোলন সফল হোক!
আত্মতুষ্টির কোন জায়গাই নেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পক্ষে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।।
৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৪
জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের ঐতিহাসিক লালবাজার অভিযানে যতসামান্য উপস্থিত হয়ে অনেক কিছু শিখলাম। সুশৃঙ্খল শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অথচ দৃঢ়কল্প, পরিণত এবং সফল আন্দোলন কিভাবে করতে হয় এই প্রত্যয়ী উজ্জ্বল তরুণ তরুণীদের থেকে দেখলাম। এরসাথে অবাক হয়ে দেখলাম সাধারণ মানুষ, শিল্পী, পেশাজীবিদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং আশীর্বাদ।
পাশাপাশি এটিও দেখছি পশ্চিমবঙ্গে স্বঘোষিত বেশ কিছু বাম, বিপ্লবী, প্রগতিশীল, বিদ্বজ্জন ইত্যাদি নানাকিসিমের দল ও ব্যক্তি আছে যাদের না আছে কোন গণভিত্তি, না আছে কোন জনমুখী কার্যকলাপ। অনুপ্রেরণা, অনুদান প্রভৃতি গ্রহণ ও বিনিময়ে লেজুড়বৃত্তি ছাড়া ৩৪ বছরের বাম শাসনে এবং ১৩ বছরের তৃণ শাসনে তারা মানুষের জন্য কিছুই করতে পারেনি। এই গণ জাগরণ থেকেও তারা দূরে বা নিষ্ক্রিয় কিংবা একেবারে গণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় ও নাৎসি নেত্রীর অনুকম্পা হারানোর ভীতি উভয় সংকটের মধ্যে কোনরকম নাগরিক হয়ে টোকেন অংশগ্রহণ।
সমাজের বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, গুণী তরুণ – তরুণী, নারী প্রমুখ বিভিন্ন অংশ থেকে উঠে আসা গণজাগরণের তরতাজা নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে এদের অনুপস্থিতি বা সেভাবে না থাকাটা এই আন্দোলনের পক্ষে অবশ্যই মঙ্গল। নতুন শক্তি, মানুষ এবং নতুন নতুন ফর্ম হচ্ছে এই গণজাগরণের একাধারে প্রাণশক্তি ও বৈশিষ্ট্য।
বন্যা, পুজো, কার্নিভাল কিংবা দমনপীড়ন, টোপ, চক্রান্তের মধ্যে এই সম্মিলিত গণআন্দোলনকে ও গণজাগরণকে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও গ্রাম স্তর এ কিভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, মুসলমান ও অবাঙ্গালী জনসংখ্যার মানুষকে কিভাবে যুক্ত করা যায় এবং এই গণ জাগরণ কে ন্যায়, মঙ্গল ও সুন্দরের পথে আগামী দিনে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেটি ই এখন পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত।










যথাযথ বিশ্লেষণ । এখন এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলনকে ঝিমিয়ে পড়তে দেওয়া চলবে না। এই জঘন্য অমানুষদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতেই হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এরকম নারকীয় ঘটনার বলি না হতে পারেন। এই গণ অভ্যুত্থান এক দৃষ্টান্ত হয়ে যেন ইতিহাসের পাতায় জায়গা নিতে পারে।
🌹✊