বরুণবাবু গোছানো মানুষ। তিনি চাকরি জীবনের শুরু থেকেই অবসর পরবর্তী জীবনের কথা ভেবেছেন। তিনি জানতেন, যা পেনশন পাবেন, তাতে খাওয়া দাওয়ার বিশেষ অসুবিধা হবে না। সমস্যা হতে পারে বড়সড় অসুখে পড়লে।
বরুণবাবু জানতেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় না। অতএব বেসরকারি হাসপাতালই ভরসা। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ পেনশনের টাকায় চালানো মুশকিল। তাই তিনি বহু বছর ধরে একটা মোটা অঙ্কের মেডিক্লেম করে রেখেছেন।
বরুণবাবু কোনো দিনও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি নিয়ে চিন্তা করেননি। নিজের দুই ছেলেকেই বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়েছেন। তার দুই ছেলেই নামকরা প্রাইভেট কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ইংল্যান্ডে ভালো চাকরি করে। তিনি ছেলেদের পিছনে যা অর্থ লগ্নি করেছিলেন, এখন একজনই একবছরে তার চেয়ে বেশি আয় করে।
বরুণবাবু কোনও দিন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়েও মাথা ঘামান নি। কমতে কমতে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জি ডি পির এক শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি তাই নিয়ে গলা ফাটান নি। তিনি জানতেন সরকারি হাসপাতালে যায় গরীবেরা, যাদের অন্য কোথাও যাওয়ার মতো অর্থ নেই। তার কাছে অর্থ আছে, বিশাল অঙ্কের মেডিক্লেম আছে। অতএব তিনি বা তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হলে বাইপাসের ধারে পাঁচতারা কর্পোরেট হাসপাতালে ভর্তি হবেন।
বরুণবাবু একটু স্বার্থপরের মতো বাঁচছিলেন। তাঁর জগতটা ছিল দশ শতাংশ মানুষের ভারতবর্ষ। বাকি নব্বই শতাংশ ভারতবাসীকে নিয়ে তাঁর মাথা ব্যথা ছিল না।
কিন্তু একটা অসুখ বরুণবাবুর জীবনকে দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে দিল।
তাহলে সব কিছু খুলেই বলা যাক। ইংল্যান্ডে যখন করোনা ধরা পড়ল, তাঁর দুই ছেলেই রাতারাতি দেশে ফিরে এলো। বড় ছেলে তার বিদেশী বৌ কেও নিয়ে এসেছে। এর আগেও বরুণবাবু ও তাঁর স্ত্রী রেখা দেবী বহুবার তাদের ছেলেদের দেশে ফিরতে বলেছেন। কিন্তু দুজনের কেউই পাত্তা দেয়নি। আজ ঠেলায় পরে তারা দেশে ফেরায় বরুণবাবুর মনের মধ্যে একটু খচ খচ করছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আন্তরিক ভাবে খুশি হলেন। তিনি দুবেলা ভাল মন্দ রান্না করে দুই পুত্র ও পুত্রবধূকে খাওয়াতে লাগলেন।
বড় পুত্রের সামান্য জ্বর আসছিল। তাঁর কাছে গল্প শুনলেন কিভাবে প্লেনে জ্বর আসার পরে তড়ি ঘড়ি প্যারসিটামল খেয়ে জ্বর কমিয়ে সে এয়ারপোর্টের থার্মাল চেকিং ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়েছে। রেখা দেবী সেই গল্প শুনে ছেলের বুদ্ধির প্রশংসা করলেন। বরুণবাবুও প্রশংসা করলেন। কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে খচখচানি কমছিল না।
তারপর লক ডাউন হয়ে গেল। তাতে বরুণবাবুদের খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছিল না। তাঁরা ভালই ছিলেন। কোথায় শ্রমিকরা বাড়ি ফেরার জন্য বাচ্চাদের কাঁধে বসিয়ে আড়াইশো কিলোমিটার হাঁটছে, কোথায় মুটে-মজুরদের একবেলাও ভাত জুটছে না, সেই নিয়ে তাঁদের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। বস্তিবাসীদের খাবার বিতরণের জন্য এলাকার কয়েকটি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যুবক সাহায্য চাইতে এসেছিল। বরুণবাবু তাদের খালি হাতেই বিদায় জানালেন।
কিন্তু তাদের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হল না। সাতদিনের মাথায় বরুণবাবু ও তাঁর স্ত্রী জ্বরে পড়লেন। গলা ব্যথা, সারারাত কাশি আর তীব্র জ্বর। পরের দিন বরুণবাবু ডাক্তার দেখানোর জন্য বিভিন্ন বড় নার্সিং হোমে ফোন করলেন। সব জায়গাতেই একই উত্তর, ‘এই মুহূর্তে আউট ডোর বন্ধ আছে। আপনি অন্য কোথাও দেখিয়ে নিন।’
পাড়াতেই একজন ডাক্তার সাত ফুট বাই সাত ফুট খুপরিতে দুবেলা চেম্বার করেন। একশ টাকা ভিজিট। বরুণবাবু যাতায়াতের পথে দেখেছেন। পাড়ার বিভিন্ন বাড়ির কাজের লোক, রান্নার মাসি, রিক্সাওয়ালা, ভ্যনওয়ালা, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা ঐ ডাক্তারবাবুকে দেখাতে যায়। উপায়ন্তর না দেখে বরুণবাবু আর রেখা দেবী তাঁর কাছেই গেলেন।
ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে সব শুনলেন, এমনকি প্যারাসিটামল খেয়ে বড় ছেলের থার্মাল স্ক্যানারকে ফাঁকি দেওয়ার গল্প পর্যন্ত। তিনি বললেন, ‘আপনার ছেলে অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছে। আপনি আজই বেলেঘাটা আই ডি হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।’
বরুণবাবু বললেন, ‘কিন্তু ডাক্তারবাবু, সরকারি হাসপাতালে যাব? ওখানে চিকিৎসা হবে?’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘ওখানেই চিকিৎসা হবে। ঐ পাঁচতারা বেসরকারি হাসপাতাল গুলো যারা খুলেছেন, তাঁরা কেউ সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাবে বলে খোলেননি, ব্যবসার জন্য খুলেছেন। তাঁরা যে দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে মদের ব্যবসা করেন, সেই একই দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে হাসপাতাল চালান। মদের দোকানের ম্যানেজার আর নার্সিং হোমের ডাক্তার দুটোই ওনাদের কাছে এক। আজ এই মহামারীর সময়ে যখন মানুষের সবচেয়ে বেশি হাসপাতাল দরকার তখন বেশীরভাগ কর্পোরেট হাসপাতালই রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে এসময়ে ব্যবসা করাটা দুঃসাধ্য।’
আই ডি হাসপাতালে ঘণ্টা খানেক বেশ দুর্ভোগের পর বরুণবাবু আর রেখা দেবী দুজনেই ভর্তি হয়ে গেলেন। রেখা দেবীর ততক্ষণে শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে। দুজনেরই থ্রোট সোয়াব আর রক্ত পরীক্ষা হল। দুজনেই জানতে পারলেন তাদের করোনা রোগ ধরা পরেছে। ভাইরাসের উৎস তাঁদেরই ছেলে, যে রোগ লুকিয়ে নিজের বাবা মা সহ অনেককেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বরুণবাবু আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু রেখা দেবীর নানা রকম সমস্যা দেখা যাচ্ছিল। ওনার শ্বাস কষ্ট আস্তে আস্তে বাড়ছিল। তবে চিকিৎসকরা বারবার অভয় দিয়েছেন, ভয়ের কিছু নেই। তাঁর স্ত্রী সুস্থ হয়ে যাবেন।
বরুণবাবু এই প্রথম কোনও সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখানে সব কিছুই তিনি নতুন চোখে দেখছিলেন। এখানে চিকিৎসক- সিস্টাররা রেনকোট পরে ডিউটি করেন। রেনকোট পরে এই গরমের মধ্যে দর দর করে ঘামেন। তিনি শুনলেন এক মহিলা চিকিৎসক তাঁর সাত মাসের বাচ্চাকে ছেড়ে বারো দিন ধরে হাসপাতালে পরে আছেন। ডিউটি শেষ করার পরও তিনি বাড়ি ফিরতে পারবেন না। চৌদ্দ দিন কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে।
বরুণবাবু অন্য রোগীদের গল্প শুনলেন। কমবয়সীরা নিজেরাই বিদেশ থেকে রোগ নিয়ে ফিরেছে। বয়স্কদের বেশিরভাগেরই একই গল্প। সুপুত্র বিদেশ থেকে রোগ লুকিয়ে এনেছে, এবং বাবা-মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অবশেষে দুজনেই রোগ মুক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন। একদিন লক ডাউন উঠে গেল। আস্তে আস্তে পৃথিবীও স্বাভাবিক হল। কিন্তু সেই পৃথিবী আগের মতো হল না।
বরুণবাবুর দুই ছেলেই আবার বিদেশে ফিরে গেছে। কিন্তু তাতে বরুণবাবু বা রেখা দেবীর খুব দুঃখ নেই। তাদের চারপাশকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
মহামারী উত্তর পৃথিবীতে মানুষ সকলের জন্য স্বাস্থ্যের দাবীতে সরব হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য দিকে দিকে আন্দোলন হচ্ছে। সেই সব মিছিলে শ্রমজীবী মানুষের সাথে পা মিলিয়ে বরুণবাবু আর রেখা দেবীকে প্রায়ই হাঁটতে দেখা যায়।









