সকাল থেকেই শুভেচ্ছা আসছে। যাবতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তো বটেই,হাতে হাতে চলার পথেও। চেনা অচেনা,বন্ধুবান্ধব, শুভানুধ্যায়ী থেকে শুরু করে, মাসে ছ’ মাসে দেখা রোগী অথবা তাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকেও মিলছে কার্ড,কেক অথবা চকোলেটের প্যাকেট।
ভালোই লাগে এসব।
চিকিৎসক জীবন দেখতে দেখতে যে অনেক কাল হয়ে গেল। এখন বয়স, যাকে পাবলিকের ভাষায় বলে ‘ভেটারেন ‘। বলতে বাধা নেই এ জীবনে গালাগালি র চেয়ে কপালে ভালোবাসাই জুটেছে বেশি। ভবিষ্যত যদিও জানা নেই। কিন্তু সেই ভয়ে বাস্তবকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।
আমার চিকিৎসক জীবনে দুটি অংশ রয়েছে।
একটা হাসপাতাল আর অন্যটা আমার ব্যক্তিগত ক্লিনিক। দুটো জায়গার এই দুই কর্মস্থলে’র অভিজ্ঞতা আমার বরাবর আলাদা । চেম্বারে আসা রোগীর সাথে সরাসরি সংযোগের কারণে, সম্পর্কটা অনেক বেশি গভীর । সেখানে চেনা পরিচিত, পাড়া বেপাড়া র এমন অনেক মানুষ আসেন, যাদের কাছে আমি শুধুই ‘পার্থ’ অথবা ‘পার্থ দা’। ডাক্তার গুপ্ত সেখানে নিতান্তই একজন অপরিচিত মানুষ।
আমরা যখন অনেকটাই কম বয়সী, আমাদের বাড়ির ঠিক পাশে, একটা পাঁচিল ঘেরা ছোট জমি ছিল।
রাস্তায় ক্রিকেট খেলার বল প্রায়শই উড়ে এসে পড়তো সে জমি তে। অবহেলায় বড় বড় ঘাস আর ঝোপ জঙ্গল গজিয়ে জায়গাটা ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছিল, যাকে বলে বেশ রহস্যময়। বর্ষার সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার সেই অক্লান্ত ডাকের, তাল কেটে দিয়ে যেত, জমা জলে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ব্যাঙের দল। লোডশেডিং এর সেই যুগে হ্যারিকেনের আলোতে সব কিছুকেই বড় অদ্ভুত লাগতো।
হেন সেই জমিতেও মাটি ফেলে একদিন, বাড়ি উঠলো একতলা। দুই বয়স্ক ভদ্রলোক। একজন অকৃতদার। আরেক জন কন্যাসহ সপরিবারে। কন্যাটি আমাদের চেয়ে বয়সে বড় এবং যাকে বলে অত্যন্ত ‘দজ্জাল’। বাড়ির বয়স্ক পুরুষ মানুষদ্বয় ঠিক ততোধিক ভদ্র।
বড় জনকে পাড়ার ছেলেপুলেরা ‘জ্যাঠা’ আর ছোট জনকে যেন কি একটা কারণে ‘ম্যানেজার বাবু’ বলে ডাকতো। শুনেছিলাম তিনি নাকি কোন এক ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজার। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম সেই গুজবের কোন ভিত্তি ছিল না।
যাই হোক সময় চলে যায়। আমরাও বড় হই।
ততদিনে ধীরে ধীরে সেই পাশের বাড়ি ফাঁকা হতে শুরু করে ।মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। ম্যানেজার বাবু র দাদা এবং স্ত্রী পরস্পর পরলোকে গমন করেন।
আমরা পাড়ার ছেলেরা অভ্যাস মতো বিপদের দিনে পাশে গিয়ে দাঁড়াই। ততদিনে আমার মেডিক্যাল কলেজ প্রায় শেষের দিকে । হাসপাতালের সিনিয়রদের পরামর্শ নিয়ে ওনাদের সেখানে ভর্তি করা থেকে শুরু করে, শেষ যাত্রায় পা মেলানো, সর্বত্র ই উপস্থিত থেকেছি আমি অন্য বন্ধুদের সঙ্গে।
সবাই এইভাবে চলে যাওয়ায় ভদ্রলোক একেবারেই একা হয়ে পড়লেন। সাথে রইল শুধু একটি সর্বক্ষণের কাজের লোক।
মাঝে মাঝে একদল গরীব বাচ্চাকে পড়াবার অছিলায় সময় কাটানো; এ ছাড়া সারাদিন গোটা বাড়িটাই একদম নিঝুম।
শীর্ণকায় বয়স্ক মানুষ এরপর মাঝেমধ্যে ই অসুখে পড়েন।কাজের লোক আমার কাছে ছুটে আসে।
আমি সময়, অসময়ে যাই। মাঝে মাঝে সারাদিন হাসপাতালের পরিশ্রমের পর হয়তো বিরক্ত লাগে, কিন্তু মাঝরাতেও কখনো অবজ্ঞা করতে পারি না সেই ডাক। ওষুধ পত্র লিখে, বকা দিয়ে আসি। কাজের লোকের কথা যাতে শোনেন, খাবার যাতে ঠিক সময়ে খাওয়া হয়…..,এই সমস্ত রুটিন বাঁধা সংলাপ। বুঝতে পারি দেখার কোন লোক নেই। মেয়ে আমাকে ফোন করেই তার দায়িত্ব শেষ করে।
দেখতে দেখতে এই করেই সময় চলে গেল।
দু তিন বার পক্ষাঘাত জনিত কারণে ভর্তি করতে হল হাসপাতালে। কিন্তু ঠিক বেঁচে বেরিয়ে এলেন ভদ্রলোক।
চলতে চলতে, চলে গেল আরও কিছু বছর।
একদিন সকাল বেলা দেখি একতলা বাড়ির ছাদে ইঁট পরছে। খবর পেলাম দোতলা তৈরি হচ্ছে। ভাবলাম হয়তো মেয়ের পরিবার এসে থাকবে, সেই উদ্দেশ্যে এই বৃদ্ধ বয়সে সঞ্চয় ভাঙছেন ভদ্রলোক।
কত আশা নিয়ে যে মানুষ বাঁচে; ভাবলাম আমি।
ইতিমধ্যে একদিন আমার সন্ধ্যার চেম্বারে এসে হাজির ভদ্রলোক। বেশ মেজাজ ভালো আজ, গায়ে আটপৌরে গেঞ্জির বদলে, সাদা নতুন ফতুয়াতে একেবারে ফিটফাট। প্রেসক্রিপশনের পাতায় নাম লিখতে লিখতে, আমি ঠাট্টা করে বললাম, “মেসোমশাই, বয়স কত লিখবো?”
নির্দ্বিধায় উত্তর এলো, ” একশো লেখো।”
আমার কলম বন্ধ হয়ে গেল। আমি মাথা নেড়ে বললাম,”এই চেম্বারে বসে আমি কারো বয়স একশো লিখিনি।”
“না,না, একশোই। আমি জানি।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। লিখতে বেশ মজাই লাগলো।
তারপর একদিন বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছি। দেখছি দোতলার কাজকর্ম বেশ কিছু মাস বন্ধ। এতটাই যে, নতুন ইঁটের দেওয়ালে শ্যাওলা ধরতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলে ছাদটাকে কেমন খন্ডহর মনে হয়। আমি শেষ বয়সে বৃদ্ধের নাতি নাতনিদের সঙ্গে থাকার আকুতির কথা ভেবে একটু বিষন্নই হয়ে পড়লাম। এভাবে বুড়ো বয়সে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত একা থাকা সত্যিই বড় কষ্টের।
“এই যে পার্থবাবা,তোমাকে সেদিন ভুল বলেছি একটু।”
গলা শুনে পাশের বাড়ির জানালায় চোখ আটকে গেল। কাজের লোকটির সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমাদের ‘ম্যানেজার বাবু ‘।
“আমার বয়স এখনো একশো হয় নি। আমি ম্যাট্রিকুলেশনের সার্টিফিকেট দেখলাম। ওটা ছিয়ানব্বুই হবে। “
আমি হাসলাম। আর কিছু বললাম না।
কিছুদিন পরে একদিন রাত্তিরে আবার আমার নাম ধরে ডাক শুনে ঘরের জানালা খুলে দেখলাম কাজের মেয়েটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর হাপুস নয়নে কাঁদছে।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে নিচে নেমে এলাম।
বৃদ্ধ অজ্ঞান। যদিও ব্লাড প্রেসার ঠিক রয়েছে, পালসের গতি ও প্রায় স্বাভাবিক। বুঝতে পারলাম সম্ভবত আবার স্ট্রোক হয়েছে। পরিচিত নার্সিং হোমের সাথে যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্সের বন্দোবস্ত করে, পাঠিয়ে দিলাম।
কিন্তু এইবার আর জ্ঞান ফিরলো না। চিরতরে চলে গেলেন আমাদের পাড়ার ‘ম্যানেজার’ বাবু।
জীবনের অনেক কিছুই যিনি ‘ম্যানেজ’ করে উঠতে পারলেন না।
ডেথ সার্টিফিকেটে বয়স কি লেখা হয়েছিল সেটাও আমার আর জানা হলো না।
আমার পুরনো প্রেসক্রিপশনে সেটা একশো হয়েই রয়ে গেল।
ভদ্রলোক মারা যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়ি হাতবদল হয়ে গেল। মেয়ে এবং জামাই খুব দ্রুত বাড়ি বিক্রি করে দিল। যেন তাদের খুব তাড়া ছিল। দীর্ঘদিন বৃদ্ধের যত্ন নেওয়া সেই কাজের লোকটিকেও চলে গেল কোথায়।
বাড়িটা যেন বিক্রি হওয়ার জন্যই বসে ছিল।
আমাদের চোখের সামনেই বাড়িটা ভাঙ্গা শুরু হল। পুরনো দুটো আমগাছ, বাড়ির উঠোনে ঠাকুরের মন্দির, বাইরের ঘরে বৃদ্ধের পাঠশালা, অসমাপ্ত দোতলা,সিঁড়ির ঘর সব ধীরে ধীরে চলে গেল চোখের আড়ালে।
শুধু আমার অন্তরে বায়োস্কোপের মতোই আটকে রইলো সব ঘটনা প্রবাহ, নস্টালজিয়ার মায়াজাল বিস্তার করে।
ডাক্তারিতে অভিজ্ঞতা যেভাবে বেড়ে যায় বয়সকে সঙ্গে নিয়ে।











