অবশেষে এবারকার মহাকুম্ভের সমাপ্তি ঘটল। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ও সবচাইতে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ শহর। ২০১৮ থেকে যার নামকরণ হয়েছে প্রয়াগরাজ। তার সন্নিকটে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী (বর্তমানে কোন অস্তিত্ব নেই) নদীর সঙ্গম প্রয়াগে ১৩ জানুয়ারি’২৫ এর পৌষ পূর্ণিমায় অত্যন্ত ঘটা করে ও জাঁকজমক সহকারে শুরু হয়েছিল এবারের কুম্ভ মেলা এবং পুণ্যস্নান। ঘটনাবহুল ৪৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার এবং পৌষ পূর্ণিমা, মকর সংক্রান্তি, মৌনী অমাবস্যা, বসন্ত পঞ্চমী, মাঘী পূর্ণিমা ও শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি’২৫ শিবরাত্রির ভিড়েভিড়াক্কার শাহী বা রাজযোগী স্নানের পর এবারকার মেলা সংগঠনের প্রাণপুরুষ গোরক্ষনাথ মঠের প্রধান পুরোহিত এবং উত্তর প্রদেশের দীর্ঘতম মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (অজয় মোহন বিস্ত) মেলার ‘সফল’ পরিসমাপ্তি ঘোষণা করলেন। তার সঙ্গে তিনি দাবি করলেন যে এই মহাতীর্থে এবার ৬৫ কোটি পুণ্যার্থী অর্থাৎ বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল এই দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার আগমন ঘটেছিল। এইসব দেখেশুনে তথাকথিত পুরাণ আর মহাকাব্যে বর্ণিত দেবতাদের পুষ্পবৃষ্টি করার কথা ছিল। কিন্তু ঘোর কলিকালে হেলিকপ্টার চালকের সহযোগীকে এই দায়িত্ব পালন করতে হল।
কিন্তু সমাপ্তি বললেই কি সমাপ্তি ঘটে? ইভেন্ট ও মিডিয়া ম্যানেজমেনটের যুগ্ম বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এই যে মহা আয়োজন, তাকে ঘিরে প্রবল প্রচার (Hype) এবং সব মিলিয়ে যে লাভজনক ব্যাবসা ও ভোট রাজনীতির ফায়দা তার শেষ বিন্দু অবধি ব্যাবসাদার আর রাজনীতিকরা ছাড়তে নারাজ। অন্যদিকে এই ভাঙ্গা মেলাতে এতদিন যারা কোনভাবে পৌঁছতে পারেননি তাদের মনজগতে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া চলছে যে তারাই বা কেন তাদের জীবদ্দশার মধ্যে একমাত্র সুযোগ এই যাবতীয় পাপ্ স্খালন সহ মহাপুণ্য বা মহামোক্ষ লাভ থেকে বঞ্চিত থাকবেন? সুতরাং তাদের অনেকেও অবশিষ্ট অমৃতের সন্ধানে প্রয়াগরাজে ছুটছেন। আর যে কোন বড় ব্যাবসার অনুসারী ক্ষুদ্র ব্যাবসাগুলির মত এই সুযোগে ভাগ্য ফেরাতে যত হোটেলওয়ালা, দালাল, খাবার দোকানদার, গাড়ি ও বাইক ট্যাক্সি চালক, নৌকোর মাঝি, পুরোহিত, নহাপিত, ফুল বিক্রেতা, ভানুমতীর খেলের কলাকার, মোদক, ড্রাগ পেডলার, দেহোপজীবিনী, বৃহন্নলা, ঠগ, গাঁটকাটা, ভিখিরি … সকলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ঠিকাদার ও ধর্ম ব্যাবসায়ীরা তো জমিয়ে ব্যাবসা করছেনই। পুলিশ, পুরসভার আধিকারিক, নেতা গোছের লোকজনদেরও ভাল আয়রোজগার হচ্ছে। এত ভিড় ও পুণ্যলাভের প্রতি এত উন্মাদনা (Craze) যে প্রচণ্ড ভিড়ে নিয়মিত পদপৃষ্ট হওয়া ও তজ্জনিত মৃত্যুর খবর তুচ্ছ হয়ে গেছে। অব্যাবস্থা ও ভিড়ে পদপৃষ্ট হয়ে নিউ দিল্লি রেল ষ্টেশনেও বেশ কিছু পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। লোকসানে চলা ভারতীয় রেল রেকর্ড টিকিট বিক্রি করেছে। টিকিট না কেটে চলাফেরা করা সাধুসন্ত ও আম জনতার কথা বাদ দিয়েই। উত্তর ভারত গামী এবং উত্তর ভারত দিয়ে যাতায়াত করা ট্রেনের সমস্ত সংরক্ষিত আসন পূর্ণ ছিল। ট্রেনগুলিতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ট্রেনগুলি অস্বাভাবিক দেরিতে চলাচল করেছে।
কুম্ভের ইতিবৃত্তঃ কুম্ভ শব্দের অনেক ব্যখ্যা থাকলেও মূল অর্থ মাটির কলস। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, লোক গাথা ইত্যাদিতে কুম্ভ নিয়ে যে দীর্ঘ, জটিল, ধোঁয়াশা ভরা অতিকথার আখ্যানটি (Mythical Narrative) তুলে ধরা হয়েছে সেটি হল – স্বর্গে বসবাসকারী সুদর্শন, বুদ্ধিমান, কৌশলী এবং ক্ষমতাধর দেবতারা পাতালে বসবাসকারী কুদর্শন, বুদ্ধিহীন, ক্রোধী এবং শক্তিধর অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহে কিছুতেই এঁটে উঠতে না পেরে অসুরদের ঠকিয়ে অমরত্ব লাভের পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা তিন প্রধান দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এবং দেবরাজ ইন্দ্রের সাহায্য নিলেন। বহু রকম ঘটনার পর ক্ষীর সাগরের বুকে কূর্ম অবতারের পিঠে মন্দর পর্বতকে চাপিয়ে শেষ নাগ তাকে বেষ্টন করে মন্থন শুরু করেন। সেই সময় নানারকম উদ্ভূত সমস্যা নারায়ণ, গরুড় প্রমুখরা মিটিয়ে দেন। অন্যদিকে দুর্বাসা মুনিরা জটিলতা সৃষ্টি করেন। যাইহোক, দীর্ঘ মন্থনের পর দই, ঘি, চাঁদ, লক্ষ্মী, কৌস্তভমণি, পারিজাত, শ্বেত হস্তী, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, সুন্দরী অপ্সরার দল উঠে এলে দেবতারা অসুরদের সঙ্গে সেগুলি ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। এরপর তীব্র হলাহল কালকূট উঠে এলে নীলকণ্ঠ সেটি গলাধঃকরণ করে পরিস্থিতি সামাল দেন। সমুদ্র মন্থনের শেষে ধন্বন্তরের হাতে মাটির কলসে উঠে আসে অমৃত। সঙ্গেসঙ্গে অমৃতের কলস নিয়ে দেবতারা ছুট দেন স্বর্গের দিকে। অসুররা তাদের তাড়া করেন। শেষমেশ ইন্দ্র পুত্র জয়ন্ত অসুরদের ফাঁকি দিয়ে অমৃত ভরা কলস স্বর্গে নিতে সমর্থ হন। যাত্রাপথে দেবতারা চারটি জায়গায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই জায়গাগুলিতে কিছুমাত্রায় অমৃত উপছে পড়েছিল। প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিক, সেই চারটি স্থানে প্রতি বারো বছরে একবার পর্যায়ক্রমে বৃহস্পতি, সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থান দেখে কুম্ভ মেলার আয়োজন হয়।
অতীতে প্রয়াগে প্রতি বছর মাঘী মেলা অনুষ্ঠিত হত। সপ্তম শতাব্দীতে বিশিষ্ট চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য ভ্রমণকালে সেটি পরিদর্শন করেন। অষ্টম শতাব্দীতে জনপ্রিয় বৌদ্ধ দর্শন থেকে ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্মের পুনরুত্থানের সময় শঙ্করাচার্য এই মেলার মাধ্যমে সাধু সন্তদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মোঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল রচিত ‘আইন ই আকবরি’ গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। ঐ সময় রামবোলা দুবে ওরফে তুলসিদাস রচিত ‘রামচরিতমানস’ গ্রন্থেও এর উল্লেখ আছে। ভারতীয়দের এই ধর্মীয় উন্মাদনা দমন করতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা এই মেলার উপর বিধিনিষেধ লাগু করলে ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে হরিদ্বারের আখড়াগুলি বিদ্রোহ করে। সেনা নামিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে হয় এবং ব্রিটিশ সেনাদের গুলিতে পাঁচ শতাধিক সাধু সন্ত নিহত হন। ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে একের পর এক কৃষক ও জনজাতি বিদ্রোহের পর ১৮৫৭ – ‘৫৮ তে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়ে সাময়িকভাবে ব্রিটিশ শাসনকে উচ্ছেদ করে। অনেক প্রচেষ্টায় মহাবিদ্রোহকে দমন করে ব্রিটিশরা তাদের সবচাইতে লাভজনক উপনিবেশ ভারতে ক্ষমতা সংহতকরণের উদ্দেশ্যে ভারতীয় ধর্মগুলিকে ছাড় দিতে শুরু করে। সেইসময় ব্রিটিশের তত্ত্বাবধানে ১৮৭০ থেকে সংগঠিতভাবে কুম্ভ মেলার সুত্রপাত। এরপর প্রতিবছর মাঘমেলা, প্রতি চার বছর পর কুম্ভ মেলা, প্রতি ছয় বছর পর অর্ধকুম্ভ মেলা, প্রতি ১২ বছর পর পূর্ণকুম্ভ মেলা এবং প্রতি ১৪৪ বছর পর মহাকুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। তবে ১৪৪ বছরের গল্পটি মাঝেমাঝেই শোনা যায়। বছর দুয়েক আগে হুগলীর ত্রিবেণী এবং নদীয়ার কল্যাণীর গঙ্গার ঘাটে আরেকটি ১৪৪ বছরের কুম্ভের প্রচারে কাতারে কাতারে পুণ্যার্থী উপস্থিত হয়েছিলেন। এছাড়াও তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনামে কাবেরি নদীতীরে মহামহাম জলাশয়ে মাঘমেলা উপলক্ষে দক্ষিণী কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয় কুরুক্ষেত্র, সোনিপাত, রাজিম, পানাউটি (নেপাল) প্রভৃতি ধর্মস্থানে।
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন থেকে শুরু করে ২০২৫ এ স্টিভ জোবসের বিধবা পত্নী লরেন পাওয়েল বহু বিদেশী কৌতূহলবশত অথবা প্রাচ্যের আধ্যাত্বিক শান্তির খোঁজে কুম্ভ দর্শন করেছেন। ইউনেস্কো ২০১৭ এ কুম্ভ মেলাকে বিশ্ব ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানের তালিকায় সংযোজিত করে। কুম্ভ মেলাকে বলা হতে থাকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশ। অতীতে শাস্ত্র অথবা অস্ত্রধারী মহানির্বাণ, অটল, নিরঞ্জনি, আনন্দ, জুনা, আবাহন ও অগ্নি সাতটি শৈব আখড়া; নির্বাণী ও দিগম্বরী বৈষ্ণব আখড়া এবং দত্তাত্রেয় ত্রিদেব আখড়া কুম্ভ মেলা আয়োজন করলেও এখন সরকার নির্বাচিত মেলা কমিটি মেলার যাবতীয় আয়োজন করে। তবে পরম্পরাগতভাবে আখড়াগুলি কিছু সুবিধা পায়। সঙ্গমের কাছে আখড়ার তাঁবু ফেলার জায়গা, ব্রাহ্ম মুহূর্তে সবার আগে সাধু সন্তদের শাহী স্নানের সুযোগ ইত্যাদি। তারাও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, কীর্তন, ধর্মোপদেশ, লঙ্গর প্রভৃতির আয়োজন করে। নাংগা সন্ন্যাসী, নাগিন সন্ন্যাসিনী, আইআইটি বাবা থেকে সাধ্বী মমতা কুলকারনি ইত্যাদি রোমাঞ্চকর বিষয়গুলি থাকে কুম্ভের বিশেষ আকর্ষণ।
একদিকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত মানুষের ভিড়, সেখানে খাওয়া থাকা মলমূত্র ত্যাগ, ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের কারণে কুম্ভে স্নান নিয়ে তাদের পাগলপারা মনোভাব; অন্যদিকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, রাজ্য ও জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, মেলা কমিটি কর্তৃক উপযুক্ত পরিকাঠামো, ব্যাবস্থাপনা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পুণ্যার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব; দায়িত্বশীল আধিকারিক, পুলিশ, কর্মী, স্বেচ্ছাসেবকদের একাংশের সংবেদনশীলতার অভাব, অবহেলা ও দুর্নীতি কুম্ভ মেলায় একের পর এক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। ১৯৫৪ ও ১৯৮৬ তে পদপৃষ্ট (Stampede) হয়ে বহু পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়। ২০২১ এর কুম্ভ মেলা থেকে কোভিড রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে (Super spreader)। এবারের মেলায় পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্যবিধির (Sanitation) খাতে উত্তর প্রদেশ সরকার সাত হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে এবং কৃত্রিম মেধা, চ্যাটবট, লেজার, অ্যাপস প্রভৃতি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে। এছাড়াও ১৪২৮.৬৮ কোটি টাকার ৮৩ টি প্রকল্প সম্পূর্ণ করেছিল। ধনী, প্রভাবশালী, নেতাদের জন্য ভাল ও বিশেষ ব্যাবস্থা ছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সহ অন্যান্য মন্ত্রী নেতা ও সাংসদ, মুখ্যমন্ত্রী সহ রাজ্যের মন্ত্রী নেতা আধিকারিক, শিল্পপতি, ধনী ব্যাবসায়ী, ধনী বিদেশী ও এনআরআই, সেলিব্রিটি, দুই ভারত বিধাতা মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানিদের প্রতি আপ্যায়নের ত্রুটি ছিলনা এবং তাদের মহাকুম্ভে এয়ারপোর্ট থেকে কনভয় নিয়ে ভিআইপি এলাকা দিয়ে যাতায়াত, ফাইভ স্টার প্লাসে থাকা – খাওয়া এবং একদম সঙ্গমে ভালভাবে নাওয়ার কোন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু বিপদে পড়েছেন আম জনতা। না ছিল পর্যাপ্ত যানবাহন, না ছিল থাকা খাওয়া স্নান ও শৌচালয়ের ব্যাবস্থা। মাঝ রাত্তিরে উঠে পুলিশ – স্বেচ্ছাসেবকদের ঘাড়ধাক্কা ও ভিড়ের চাপ সহ্য করে, বালি কাদা নোংরার মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে, সঙ্গম থেকে দূরে কলুষিত নদীর দূষিত জলে ঠেলাঠেলি করে কোনরকমে একটি ডুব দিয়ে তারা অমৃত লাভ করেছেন কিনা জানা নেই, তবে নিদারুণ কষ্ট পেয়েছেন সেরকম খবর নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। পদপৃষ্ট হয়ে, দুর্ঘটনায়, যাতায়াতের ধকলে, প্রবল ঠাণ্ডায়, সংক্রমণে, বয়সজনিত কারণে বহু পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সঠিক সংখ্যা জানানো হয়নি। বহুক্ষেত্রে মৃতদেহের ময়না তদন্ত হয়নি, ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি, মৃতদেহকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কয়েকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
কুম্ভের লাভ লোকসানঃ ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের প্রয়াগরাজ শহরের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৬,২৫,০০০। সেখানে ৪৫ দিন ধরে হলেও ৬৫ কোটি মানুষের আগমন সম্ভব কিনা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে কেন্দ্র ও উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার যে এবার সুপরিকল্পিতভাবে ও দক্ষ প্রচারের ঢেউ তুলে মহাকুম্ভের প্রতি ধর্মপ্রাণ ভারতীয়দের, বিশেষ করে পূর্ব, উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের হিন্দিভাষী রাজ্যগুলির বাসিন্দাদের, প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে এবং তাদের প্রয়াগরাজে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে একথা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। মহাকুম্ভ নিয়ে এবার সংবাদ মাধ্যমে এবং জনমানসে যা প্রচার ও চর্চা হয়েছে রাম মন্দির ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে তা হয়নি। ফলে নিঃসন্দেহে বিজেপি জাতীয় স্তরে এবং হিন্দি বলয়ে তার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে লাভবান এবং সঙ্ঘ পরিবার তার হিন্দু পাদশাহীর কর্মসূচি রুপায়নে আরও কার্যকর হবে। আসন্ন বিহার, উত্তর প্রদেশ প্রভৃতি বিধানসভা নির্বাচনে ভোট বাক্সেও এর কিছু প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি রামমন্দিরের মত কুম্ভ মেলার অতি পবিত্রস্থানকে ঘিরে বেনারস – প্রয়াগরাজ – অয্যোধ্যা সার্কিটে ধর্মীয় পর্যটন ব্যাবসার দিক থেকেও উত্তর প্রদেশ সরকার লাভবান হচ্ছে এবং আরও হবে।
ব্রাহ্মণ্যবাদ (Brahminism), পিতৃতন্ত্র (Patriarchy), বর্ণাশ্রম প্রথা (Caste System) এবং উচ্চবর্ণ বা বর্ণহিন্দুদের কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব (Higher Caste Control and Supremacy) অটুট রেখে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) বিগত ১০০ বছর ধরে যে হিন্দুত্ব (Hindutva) ও হিন্দু ঐক্যের (Hindu Unity) অনুশীলন এবং সামাজিক পরিবর্তন (Social Engineering) চালিয়ে যাচ্ছে এবং পশ্চাদপদ (OBC), দলিত (Dalit) ও জনজাতিদের (ST) একেকটি জাতিকে ধরে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের বৃহত্তর সঙ্ঘ পরিবারের ছাতার নিচে জড়ো করতে পেরেছে একইভাবে কুম্ভর ক্ষেত্রেও তারা সফল। আরএসএসের ৪৪ টি প্রান্তের ১৬ হাজারের বেশি স্বয়ংসেবক এবং সঙ্ঘ পরিবারের অন্যান্য শাখা সংগঠনের বেশ কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত এক করে কুম্ভে কাজ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে উপবিতধারী পূজাপাঠ করা একদা বামপন্থী বর্তমানে তৃণ – বিজেপি দক্ষিণপন্থীরা এবার সমাজমাধ্যমে কুম্ভের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। এক্ষেত্রে একদা মার্ক্সবাদী পরবর্তীতে ভোগবাদী বিশিষ্ট সাহিত্যিক কালকূটের বিখ্যাত ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ বইটি তাদের সহায়ক হয়েছে। সঙ্ঘ পরিবার ১৯৮৯ এর কুম্ভ থেকে রাম জন্মভূমি আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। ২০১৩ র কুম্ভে নরেন্দ্র মোদীকে তাদের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ নির্বাচিত করে। আর আরএসএসের শতবর্ষে ২০২৫ এর মহাকুম্ভে কাশী – মথুরাকে মুক্ত করার কর্মসূচি জোরদার করেছে।
বিজেপির আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যোগী আদিত্যনাথের মূল উদ্যোগ থাকলেও উদ্বোধনী মঞ্চে মোদী একক অনুষ্ঠান করে সমস্ত প্রচার ও কৃতিত্ব কেড়ে নিয়েছিলেন। তাই মোদী সহ অন্য নেতারা কুম্ভে এলেও যোগী আদিত্যনাথ একবারের জন্যও এবার রাশ ছাড়েননি। যদিও মোদী বক্তৃতায় ও এক্স হ্যান্ডেলে যথারীতি কৃতিত্ব দাবি করেছেন। অন্যদিকে যোগী আদিত্যনাথও বেশ কিছু অঘটনকে পাত্তা না দিয়ে এবারের কুম্ভের রেকর্ড জনসমাগমের কৃতিত্ব দাবি করেছেন। তাঁর পাখির চোখ পরবর্তী উত্তর প্রদেশ নির্বাচন সহ মোদী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর কুরশি।
ভারতীয় পরিস্থিতি এবং বাস্তব রাজনীতি (Realpolitik) সম্পর্কে এখনও অজ্ঞ থেকে যাওয়া রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিজেপির এই সফল ও সংগঠিত ধর্মীয় রাজনীতির কোন বিকল্প দাঁড় করাতে পারছেনা। এবারও গান্ধী পরিবার কুম্ভে ডুব দেবে কি দেবে না ভাবতে ভাবতেই কুম্ভ চলে গেল। অরবিন্দ কেজরিওয়াল নরম হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপির সঙ্গে পেরে না উঠে সাম্প্রতিক দিল্লি নির্বাচনে পরাস্ত হয়ে কুম্ভ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেননি, দেখাননি স্বভাবসুলভ অতিসক্রিয়তা। কুম্ভের অব্যাবস্থা নিয়ে, বহু মানুষের মৃত্যু এবং নিউ দিল্লি স্টেশনের দুর্ঘটনা নিয়ে কংগ্রেস বা আপ সেভাবে কোন প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি। একদা হিন্দি বলয়ে শক্তিশালী সমাজবাদীদের তরফে অখিলেশ ও লালু যাদব কিছুটা বিরোধিতা করেন। মৃত্যু, অব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে তার দৃষ্টিআকর্ষণীয় সমালোচনা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে জাতীয় স্তরে বিরোধী নেত্রী হিসাবে স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ৩৫% এককাট্টা মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক এবং তার অনুপ্রেরণালব্ধ তথাকথিত ‘বিদ্দ্বজ্জন’ ও ‘বিপ্লবী’ দের আশ্বস্ত করেছেন। বামেরা কখনই ধর্মের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি। ভোটের স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলে মুসলিম মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে। আর আজ দেশজুড়ে আরএসএস – বিজেপির আগ্রাসী ধর্মীয় রাজনীতির কাছে তারা একেবারেই অসহায়।
কুম্ভ ও পরিবেশঃ একদিকে সবুজ ধ্বংস, শিল্পের ক্ষতিকর বর্জ্য, ফসিল ফুয়েলের অতি ব্যাবহার, যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming), অন্যদিকে সরকারি মদতে উত্তরাখণ্ডের গঙ্গা যমুনার উৎসস্থল থেকে আরম্ভ করে হৃষীকেশ ও ডাক পাথরের কাছে গঙ্গা ও যমুনা যেখানে সমতলে পৌঁছেছে সেখানে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যেভাবে সামগ্রিক পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং হয়ে চলেছে তার ফলে হিমবাহের জলধারাপুষ্ট গঙ্গা ও যমুনা নদী মাতাদের ভবিষ্যতও বিলুপ্ত হওয়া সরস্বতী মাতার মত। এগুলি বুঝেও না বোঝার ভান করে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যেগুলির বিভিন্ন দলের একের পর এক সরকার, বিভিন্ন পুরসভা, জেলা ব্লক ও গ্রাম প্রশাসন, শিল্প – কারখানা এবং এক শ্রেণীর মানুষ যেভাবে নদীগুলির উপর অত্যাচার করছে, নদীদের প্রবাহের গতিকে যেভাবে রুদ্ধ করছে, নদীর জলকে যেভাবে কলুষিত করছে, তাতে পবিত্র নদী গঙ্গা – যমুনার অবশিষ্ট জল আজ চূড়ান্ত দূষিত, বিষাক্ত বর্জ্যপূর্ণ এবং গ্রহণের অযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পবিত্রতার নামে সেই জল পান, ব্যাবহার ও সেই জলে স্নান চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠন এবং পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করলেও কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে ক্রমাগত অবহেলা করে চলেছে। উত্তর প্রদেশের যোগী সরকারও কুম্ভ নিয়ে তাদের ধর্মীয় – রাজনীতি ও ধর্মীয় ব্যাবসার কারণে কুম্ভের জল দূষণ নিয়ে দূষণ পর্ষদের রিপোর্ট ও সুপারিশগুলি চেপে রেখেছিল। বাস্তবিক কুম্ভে স্নান করলে বর্তমানে অমৃতের পরিবর্তে কালকূট পাওয়ার সম্ভবনা বেশি। হতে পারে নানারকম চর্ম ও পেটের রোগ এবং সংক্রমণ। এছাড়াও প্রথমে উত্তরাখণ্ডে গঙ্গা – যমুনা এবং তাদের শাখানদীগুলিতে বাঁধ দিয়ে; সমতলে গঙ্গার উপর হরিদ্বার, নারোরা, বিজনৌর ও কানপুরে এবং যমুনার উপর হাতনিকুন্ড, ওয়াজিরাবাদ ও ওখলায় ব্যারাজ দিয়ে; অসংখ্য ব্রিজ নির্মাণ করে ও নদী দুটির দুপাড়ে অজস্র সেচের খাল কেটে নিয়ে ভারতীয় সভ্যতার প্রধান ধারক – বাহক এই নদী দুটিকে ক্ষতবিক্ষত করে তাদের প্রবাহকে স্তিমিত এবং নাব্যতাকে অগভীর করে দেওয়া হয়েছে। তাই প্রয়াগরাজেও দেখা যাবে নদী খাতের পরিবর্তন এবং চড় পড়ে যাওয়া।
কুম্ভ ও হিন্দুত্বঃ প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে যাযাবর আর্যরা খাদ্য ও নিরাপদ বাসস্থানের সন্ধানে যখন মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে তখন সিন্ধু উপত্যকা সহ বিস্তৃত অঞ্চলে সাত হাজার বছরের এক প্রাচীন সভ্যতা বিদ্যমান। তারও প্রাচীন বর্তমান বালুচিস্তান অঞ্চলের মেহেরগড় সভ্যতা। আরও অনেক অনেক প্রাচীন পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের জনজাতি এবং দ্রাবিড় সভ্যতা। অনার্য সিন্ধু ও জনজাতি সভ্যতা আর্যদের থেকে অনেক উন্নত হলেও উন্নত সমর কৌশল এবং অশ্বারোহী সৈন্যের ব্যাবহারে আর্যরা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করে জনজাতিদের আরাবল্লি, বিন্ধ্যের পাহাড় অরণ্যের দিকে হটিয়ে দেয়। এরপর প্রথমে তারা বর্তমান দুই পাঞ্জাবের পঞ্চনদ উপত্যকায় থিতু হয় এবং ক্রমশ পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে প্রসার ঘটায়। এই পর্বে আর্য এবং বিভিন্ন অনার্য জাতির মধ্যে যেমন সংঘর্ষ হয় তেমনই তাদের মধ্যে মিশ্রণ ঘটে চলে ভারতীয়রা এক সংকর জাতিতে (Mixed Race) পরিণত হয়। এই সময়কার তাদের বিশ্ববীক্ষা বা আদি দর্শন চর্চা প্রকৃতির উপাসনা ও সরল নিবেদন এবং সেইসঙ্গে অজানা শক্তিগুলির রহস্য সন্ধান। আদি ঋক বেদের সময়। সমাজ শৃঙ্খলিত নয়, তবে গোষ্ঠী কেন্দ্রিক। নারী অনেক স্বাধীন। সমস্ত সম্পদ গোষ্ঠীর। এরপর একে একে এল অন্যান্য বেদ ও বেদান্ত। মেধাতিথি গৌতমের ‘ন্যায়’, কণাদের ‘বৈশেষিক’, কপিলের ‘সাংখ্য’, পতঞ্জলির ‘যোগ’, জৈমিনির ‘পূর্ব মীমাংসা’ এবং বদ্রায়নের ‘উত্তর মীমাংসা’ – শক্তিশালী ষড়দর্শন। দর্শনের জগতও বস্তুবাদী (Materialistic)। তার সঙ্গে বেদের পদ্য নিয়ে ‘সংহিতা’, গদ্য নিয়ে ‘ব্রাহ্মণ’, অরণ্য সংক্রান্ত ‘আরণ্যক’, বেদের সারসংকলন ‘উপনিষদ’। তখন ধর্মের উৎপত্তি হয়নি। আর এর আগে থেকে, সেই সময় এবং পরে জনজাতিদের মধ্যে ছিল অনৈতিকতাবাদী (Amoralist), নিয়তিবাদী (Fatalist), শাশ্বতবাদী (Eternalist), অজ্ঞেয়বাদী (Agonist) এবং যুক্তিবাদী (Rationalist) দর্শন অনুশীলনকারী আজীবক, তপস্বী ও চার্বাক সম্প্রদায়।
নদী হ্রদের মিষ্টি জল সহ অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর আদিগন্ত উপত্যকা, মনোরম জলবায়ু, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, কৃষি পদ্ধতি আবিষ্কার, ধাতুর সরঞ্জামের ব্যাবহার এবং সব মিলিয়ে উৎপাদিকা শক্তির ব্যাপক বিকাশ ঘটে এবং ভূ, কৃষি, ধাতু, গাভী, স্ত্রী (বিজিত গোষ্ঠীর নারীদের দখল সহ) এবং দাস সম্পদের অভূতপূর্ব শ্রীবৃদ্ধি হয়। সেগুলি ভোগ দখলে রাখতে, কষ্টকর শ্রম থেকে অব্যহতি পেতে এবং মৃত্যুর পর দখল করা সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত করতে উৎপত্তি হল ব্যাক্তিগত সম্পত্তি, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং বর্ণাশ্রম প্রথা। ব্রাহ্মণকেন্দ্রিক জাত ব্যাবস্থার উপর ভিত্তি করে অঞ্চলের সম্পদের উপর কর্তৃত্বের জন্য সৃষ্টি হল রাজতন্ত্র। এবার এই ব্রাহ্মণ পুরোহিত ও ক্ষত্রিয় রাজারা তাদের স্বার্থ ও শ্রেষ্ঠত্বকে চিরস্থায়ী করতে ‘ব্রহ্মসুত্র’ এবং যাজ্ঞবল্ক্য, মনু প্রমুখের তাদের সহায়ক বিধানগুলি নিয়ে তৈরি করলেন ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্ম। যার নিগড়ে বেধে ফেলা হল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে। ব্রাহ্মণ পু্রোহিতদের ক্রিয়াকলাপে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পরবর্তী সময়ে দুটি শক্তিশালী দর্শন – (১) নিরীশ্বর ও বহুত্ববাদী জৈন এবং (২) অনিত্য, অনাত্মা ও অভৌতিকবাদী বৌদ্ধ, বিশেষত বৌদ্ধ দর্শনের প্রতি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হন। বৌদ্ধ দর্শন জম্বুদ্বীপের বাইরেও বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
সিন্ধু নদের পশ্চিমপাড়ের অধিবাসীরা সিন্ধকে হিন্দ উচ্চারণ করত। সেখান থেকে হিন্দু শব্দের উৎপত্তি ধরা হয়। হিন্দু কোন একমুখী দর্শন নয়। মানবতাপ্রেমী, উদারপন্থী বহু দার্শনিক ধারার সমাহার। তাদের কেউ ঈশ্বরবিশ্বাসী, কেউ ঈশ্বরবিশ্বাসী নন, কেউবা ঈশ্বরউদাসীন। তাদের কেউ পৌত্তলিক, কেউ নন, আবার কেউ একেশ্বরবাদী। কেউ শৈব, কেউ শাক্ত, কেউ বৈষ্ণব, কেউবা মাতৃসাধক। কেউ গৃহী, কেউ সন্ন্যাসী। বহুরূপী ভারতীয় দর্শন এবং প্রকৃতি ও মানবপ্রেমী ভক্তিরসে সিঞ্চিত সনাতনী দর্শনের সঙ্গে জাতপাত ও নিয়মতান্ত্রিক ব্রাহ্মন্যবাদের সম্পর্ক নেই। সংঘ পরিবার এই আগ্রাসী জনবিরোধী ব্রাহ্মন্যবাদকেই হিন্দুত্ব বলে চালাতে চাইছে। প্রাচীনকালে প্রয়াগ সহ বহু স্থানে মানুষের মিলন মেলা ছিল। সেখানকার জল ও জীবন প্রদানকারী স্বচ্ছতোয়া নদীগুলি মানুষের কাছে ছিল অতি পবিত্র। মানুষ সেখানে স্বেচ্ছায় অংশ নিয়ে স্নিগ্ধ, ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধ হত। কোন রাষ্ট্রীয় প্রচারে জীবন হাতে নিয়ে পশুর মত যেতে হত না। হত না মেলা বা স্নান নিয়ে ধর্মীয় রাজনীতি, ভোটের মহড়া কিংবা কর্পোরেট ব্যাবসা।
২৬.০২.২০২৫










অসামান্য নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং আলোচনা। সমৃদ্ধ হলাম।