অর্থোপেডিক্সে ক্রনিক রোগী খুব কম। কিন্তু অনেক রোগীই বারবার আসে।
কেউ অপারেশনের পরে ফলো আপ চেক-আপে। কেউ সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরে বাড়ির অন্য রোগী, বন্ধু, আত্মীয় স্বজন বা নিজের অন্য সমস্যা নিয়ে আসে। এসব ক্ষেত্রে ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে একটা বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
এমনই এক রোগী গত পরশু এসেছিলেন। ধরা যাক তাঁর নাম সুবিমল দাস (আসল নাম নয়)। ২০১২ সালে মেরুদন্ডে অপারেশন করেছিলাম তার। মেরুদন্ডে পুঁজ জমে হঠাৎ প্যারালাইসিস হয়ে গেছিল। সঙ্গে প্রবল জ্বর। ইনফেকশন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শরীরে। জটিল পরিস্থিতি। যমে-মানুষে টানাটানি। তিন-চারদিন ভর্তি থেকে শরীরের ইনফেকশন একটু কন্ট্রোল করে মেরুদন্ডের হাড় কেটে পুঁজ বের করা হয়েছিল। তারপর মেরুদন্ডের হাড় জোড়ার জন্য রড-স্ক্রু লাগানো হয়েছিল। সহকর্মীদের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলাম তখন। ইনফেকশনের মধ্যে ধাতব রড-স্ক্রু ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু পরবর্তীকালে সেটাই প্রচলিত পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়। সে অন্য কথা।
রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছিল- এটাই বড় ব্যপার। তবে বয়স হয়েছে। একবার-দুবার হাঁটুর সামান্য ব্যথা নিয়ে এসেছিলেন। তাছাড়া, বাড়ির লোক, পাড়া-প্রতিবেশী আর বন্ধুবান্ধব কতজনকে এনেছেন গত তেরো বছরে- গুণে শেষ করা যাবে না।
এইদিন এসেছিলেন স্ত্রীকে দেখাতে। হুগলী-বর্ধমানের মাঝামাঝি অঞ্চলে বাড়ি। চাষবাস, মূলত আলুর। আগে নিজেই সব করতেন। এখন ছেলেরা বড় হয়ে হাল ধরেছে।
অবশ্য বয়স হয়ে গেছে বললেই উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘কোথায় বয়স হয়েছে? আমি এখনো চার মাইল দৌড়াই। পুকুরে সাঁতার কাটি!’
সেদিন চেম্বারে ঢুকেই বললেন, ‘আপনাদের কলকাতায় আর আসব না।’
‘কেন? কি হল?’
বেশ রেগে গিয়ে বললেন, ‘বাসে বসে আছি। সীট থেকে তুলে দিল, জানেন!’
‘সে কি? লেডিস সীটে বসে পড়েছিলেন না কি?’ ভদ্রলোকের গিন্নী মুচকি হাসলেন।
ভদ্রলোক আরো রেগে গিয়ে বললেন, ‘লেডিস সীটে বসব কেন? আমার মানসন্মান নেই? সিনিয়র সিটিজেনদের সীটে বসে ছিলাম। কন্ডাকটর বলল, উঠে পড়ুন, এটা সিনিয়র সিটিজেন সীট!’
‘বলবেই তো! আপনার বয়স পঁয়ষট্টি, অথচ দেখে মনে হয় পঁয়তাল্লিশ। একটা চুল-ও পাকেনি!’
‘কি করব? চুলে সাদা রং করে নেব?’
‘তা কেন? আধার কার্ড সঙ্গে রাখবেন। বের করে বয়স দেখিয়ে দেবেন।’
কি একটা ভেবে বললেন, ‘আমাকেও একটা নতুন প্রেসক্রিপশন করে দিন তো! আপনার প্রেসক্রিপশনে তো বয়স লেখা থাকবে। ওটা দেখিয়ে দেব।’
‘সে দিচ্ছি। কিন্তু আগে ম্যাডামের ফাইলটা দিন। ওনাকে দেখি।’
‘কেন, গিন্নিকে কেন? আমি আপনার পুরোনো রোগী। আমাকে আগে দেখবেন না কেন?’
মজা করে বললাম, ‘লেডিস ফার্স্ট। মেয়েদের আগে দেখতে হবে। দেশের আইন আছে।’
দেখানোর শেষে বেরোতে বললেন, ‘আমার বৌ, ছেলে, বৌমা, ভাই, ভাই-এর বৌ – কেউ ব্যয়াম করে না। খালি খায়, টিভি দেখে আর ঘুমোয়। আর আমি ব্যয়াম করি বলে আমাকে প্যাঁক দেয়।’











